দেশজুড়ে

স্টেশন ক্লাব মাঠেই খোলা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্প

১৯৭১ সালের শুরুতেই উত্তাল হয়ে ওঠে অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্র, যুব সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ। বাঙালি-পাহাড়ি কেউ বসে থাকেননি।

কিশোর, যুব, বৃদ্ধ সংগঠিত হন যুদ্ধে। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ কোনো ভেদাভেদ ছিল না। লড়েছিলেন পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে কাহিনীগুলো তুলে ধরেন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা ইউনিট কমান্ডার রবার্ট রোনাল্ড পিন্টুসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।

আলাপচারিতায় তারা বলেন, তখন হানাদরদের বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে প্রবল প্রতিরোধ। যুদ্ধকালীন পুরোটা সময় পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে গড়ে ওঠে প্রতিরক্ষাব্যুহ। মুক্তিপাগল মানুষের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পিঁছু হটতে বাধ্য হয় শত্রুবাহিনী।

অবশেষে শোচনীয় পরাজয় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয় তারা। ১৪ ডিসেম্বর সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়।

যুদ্ধে অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বর্ণনা মতে, মার্চের শুরুতেই পাহাড়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। রাঙামাটিতে তৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান ও সুনীল কান্তি দে, রামগড়ে কাজী রুহুল আমিন ও সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরা এবং খাগড়াছড়িতে দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দেন।

একইভাবে বান্দরবানেও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সংগ্রাম পরিষদগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কাজ ছিল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন, পরিচালনা, বিভিন্ন কর্মসূচি পালন, রাজপথে মিছিল, সমাবেশ, বিক্ষোভ প্রদর্শনসহ চলমান আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।

’৭১’র ২৭ মার্চ রাঙামাটি স্টেশন ক্লাবের মাঠে খোলা হয় মুক্তিযুদ্ধের অস্থায়ী ট্রেনিং ক্যাম্প। ওই ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপনের জন্য তৎকালীন জেলা প্রশাসক হোসেন তাওফিক ইমাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আবদুস সামাদ, পুলিশ সুপার বজলুর রহমান ও মহকুমা প্রশাসক আবদুল আলীসহ মুক্তিকামী সর্বজনতা সর্বাত্মক সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।

ক্যাম্পে রাইফেল ট্রেনিংসহ ককটেল বানানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। রাঙামাটি সরকারি কলেজের বিজ্ঞানাগারের রসায়ন বিভাগের যাবতীয় কেমিক্যাল এ কাজে ব্যবহৃত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে যখন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছিল ঠিক তখন রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে যুদ্ধের বহর নিয়ে রাঙামাটি আসেন তৎকালীন মেজর (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি) জিয়াউর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন কাদের, ক্যাপ্টেন শওকত, ক্যাপ্টেন করিম ও ক্যাপ্টেন হারুনসহ সামরিক কমান্ডাররা।

তারা জেলা প্রশাসক বাংলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে দিক-নির্দেশনা দেন।

এতে রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতারা আরও বেশি অনুপ্রাণিত ও সুসংগঠিত হতে থাকেন। ২৯ মার্চ ৬০ জনের একদল মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যায়। তার আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত ইপিআরের বাঙালি অফিসার ও জোয়ানরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে চলে আসেন রাঙামাটি।

এদিকে, ১৫ এপ্রিল পাকবাহিনী রাঙামাটিতে গোপনে অবস্থান নেয়। কিন্তু জানা ছিল না মুক্তিযোদ্ধাদের। ফলে ওদিন পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন মুক্তিযোদ্ধা আবদুস শুক্কুর, এসএম কামাল, শফিকুর রহমান, ইফতেখার, ইলিয়াস, মো. মামুন, আবুল কালাম আজাদ ও আবদুল বারী। তাদের মধ্যে আবুল কালাম আজাদ ও আবদুল বারী ছাড়া বাকিদের নির্মমভাবে হত্যা করে পাকবাহিনী।

পরে ২০ এপ্রিল বুড়িঘাট ও নানিয়ারচরের অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে পাকবাহিনী। তখন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের একটি অংশ এবং ইপিআরের কিছুসংখ্যক সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ছিলেন বুড়িঘাট অঞ্চলের চেঙ্গী খালের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত। তিনি কোম্পানির মেশিনগানার হিসেবে রাঙামাটি-মহালছড়ি নৌপথে প্রহরারত ছিলেন। ওদিন পাকবাহিনী মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা এলাকায় ঢুকে তিন ইঞ্চি মর্টার ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে অবিরাম গোলাবর্ষণ করতে থাকে।

এতে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। একমাত্র মুন্সী আব্দুর রউফ নিজের অবস্থানে সুদৃঢ় থেকে শত্রুবাহিনীর ওপর মেশিনগান দিয়ে অবিরাম গোলাবর্ষণ করতে থাকেন।

এতে শত্রুদের দুটি লঞ্চ ও একটি স্পিডবোট পানিতে তলিয়ে যায়। ধ্বংস হয় দুই প্লাটুন শত্রুসেনা। সে সময় শত্রুর প্রবল গোলাবর্ষণের মুখেও মুন্সী আব্দুর রউফ মেশিনগান নিয়ে নিজের অবস্থানে স্থির ছিলেন।

কিন্তু হঠাৎ শত্রুপক্ষের মর্টারের গোলা তার অবস্থানে আঘাত করলে সেখানেই শাহাদৎ বরণ করেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ।

আগস্টের মাঝামাঝি মিত্র ও মুক্তিবাহিনী রাঙামাটির বিলাইছড়ির ফারুয়া ক্যাম্পে যৌথ আক্রমণ চালায়। এতে বিনা রক্তপাতে শত্রুবাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

১৪ ডিসেম্বর সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়। তার আগে ৮ ডিসেম্বর রামগড়, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান শত্রুমুক্ত হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে রাঙামাটিতে বিজয়ের পতাকা উড়ানো হয় ১৭ ডিসেম্বর।

সুশীল প্রসাদ চাকমা/এএম/পিআর