বৈশাখ মানেই আনন্দ। নতুন পোশাক পড়ে দিন-ভর আনন্দময় দিন কাটানো। কাঙ্খিত এই দিনটিকে আরও বৈচিত্র্যতায় রাঙাতে নতুনভাবে নিজেকে উপস্থাপনের ইচ্ছা সকলেরই। আর সেই ইচ্ছা পূরণের প্রায় সকল বয়সী নারীদের অন্যতম অনুসঙ্গ তাঁতের শাড়ি।
বৈশাখ উপলক্ষে দেশের বাজারে শাড়ির বড় রকমের একটা চাহিদা তৈরি হয়। সেই চাহিদা মেটাতে ভারতীয় সিরিয়ালে দেখা নানা নামের নানা ডিজাইনের নতুন নতুন শাড়ি তৈরেতে ব্যস্ত সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লীগুলো। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী, এনায়েতপুর ও উলাপাড়া তাঁত পল্লীতে শুরু হয় তাঁত বুননের খটখট শব্দ, একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে পাওয়ার লুমও। মাঝে মাঝেই শোনা যায় তাঁতীদের উচ্চ কণ্ঠে ঘুম তাড়ানি গানের সুর। বর্তমানে এই অঞ্চলের তাঁতীরা এখন নির্ঘুম সময় পার করছেন তাঁত বুননে।
সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ, রান্ধুনীবাড়ী, মাইঝাইল, মুলিবাড়ী, বেলকুচি উপজেলার বেতিল, তামাই, সোহাগপুর, চন্দনগাঁতী, শাহজাদপুর উপজেলার খুকনী এবং উলাপাড়া ও কামারখন্দ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের বেশিরভাগ সময়ই অনেকটা বসে ও অলস সময় কাটাতে হয় সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার তাঁতপল্লীর কারিগর ও শাড়ি তৈরির শ্রমিকদের। আবার কাজ থাকলেও চাহিদা ও কদর থাকে না আগের মতো। তবে ব্যতিক্রম বাঙালির চিরায়ত উৎসব পহেলা বৈশাখের আগের প্রায় পুরোটা মাস। এ সময়টা সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লীগুলোতে নিয়ে আসে চরম ব্যস্ততা। কাজের চাপে অবস্থা এমন হয় যেন ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া ও ঘুমাবারও ফুসরত থাকে না শাড়ি তৈরির কারিগরদের। ফলে অতিরিক্ত মৌসুমী শ্রমিকদের ব্যবস্থা করতে হয়। এবারও আসন্ন পহেলা বৈশাখ ঘিরে তুমুল ব্যস্ত সময় যাচ্ছে সিরাজগঞ্জের তাঁত পলীগুলো।
ব্যস্ততার পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে আক্ষেপের কথাও জানালেন শ্রমিকরা। অন্যান্য পেশায় বৈশাখের সময় বোনাসের ব্যবস্থা থাকলেও, তাদের এটি নেই। যে কারণে সারাবছর কাজ করেও পরিবারের সঙ্গে পহেলা বৈশাখের আনন্দ ভাগ করে নিতে বেগ পেতে হয় তাদের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, সদর উপজেলায় প্রায় দেড় লাখ হস্ত ও ইঞ্জিনচালিত তাঁত রয়েছে। আর এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। তারা সারা বছরই শাড়ি-লুঙ্গি, গামছা, ধুতি, থ্রি পিস উৎপাদন করে দেশের মানুষের চাহিদার বড় একটি অংশ মিটিয়ে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে রফতানি করে আসছেন।
স্বাধীনতার পর থেকে বাৎসরিক দুই ঈদ ও পূজাকে কেন্দ্র করে তাঁতীরা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু গত ৯ বছর ধরে বাংলা নববর্ষ-পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র্র করে নতুন আরেক বাজার সৃষ্টি হয়েছে। তবে তা লুঙ্গির নয়, শাড়ির।
বাংলাদেশের বৈশাখী শাড়ি ভারতের শাড়ির চেয়ে গুণগতমানে উন্নত। শতভাগ সুতি, চিকন সুতায় বাংলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিক নকশায় তৈরি বাংলাদেশের শাড়ি পড়তে বেশি আরামদায়ক এবং তুলনামূলক দামও কম। সিরাজগঞ্জের তাঁতীরা দুই মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে তৈরি করছেন এসব শাড়ি। ঢোল, একতারা, তবলা, দোতারা, ডুগডুগি, কুলা, প্রজাপতি, পাখা, কলস, শহীদ মিনারসহ গ্রাম বাংলার নানা ঐতিহ্যের আলপনা-নকশা সম্বলিত এ শাড়িতে অন্য বছরের তুলনায় এবার আনা হয়েছে বৈচিত্র্য।
বৈশাখী শাড়ি তৈরির এই মৌসুমে জেলায় পাঁচ শতাধিক স্কিন প্রিন্ট কারখানা গড়ে উঠেছে। প্রতি কারখানায় প্রতিদিন গড়ে নকশা হচ্ছে চার শতাধিক শাড়ির। সবমিলে সিরাজগঞ্জের তাঁতের শাড়ির চাহিদা দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, গত ৯ বছর ধরে বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতে এ দেশীয় তাঁতের সুতি শাড়ির বড় একটি বাজার সৃষ্টি হওয়ায় সেদেশে এখানকার শাড়ির ব্যাপক চাহিদা। কলকাতার বড়বাজার, দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিপণি বিতান ও কাপড়ের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের শাড়ি। আশা করা হচ্ছে এবারের পহেলা বৈশাখে সিরাজগঞ্জ জেলা থেকেই এবার ১২শ টাকা থেকে ১৫শ টাকা পাইকারি দরের শত কোটি টাকার বৈশাখী শাড়ি ভারতে রফতানি হবে।
এজন্য বৈশাখী শাড়িতে এবার আরও বৈচিত্র্য এনেছে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের তাঁতীরা। এবারের বাংলা নববর্ষে এপার-ওপারের বাঙালি নারীরা বাংলাদেশের শাড়িতেই মাতবে এমনটাই আশা করছেন সিরাজগঞ্জের তাঁতীরা। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে শ্রমিকদের ন্যূনতম চাহিদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো দূর করতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আশা করছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা।
চাহিদা সম্পন্ন শাড়ি সংগ্রহের জন্য ভারত তথা বিভিন্ন দেশে শাড়ি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান সাহা টেক্সটাইলের কর্ণধার কান্তি সাহা সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার খামার গ্রামের ‘টাঙ্গাইল তাঁত বাজার’ কারখানায় এসে অর্ডার করে গেছেন ২০ লাখ টাকার শাড়ি। এছাড়াও এনায়েতপুর থানার খুকনী গ্রামের হাজী ছানোয়ার হোসেন, হাজী আব্দুস ছালাম, হাজী আব্দুস ছাত্তার ও হাজী সফিকুল ইসলামের বাড়িতে উৎপাদিত বৈশাখী শাড়ি ভারতীয় ব্যাপারিরা এসে নিয়ে যান এবং এনায়েতপুরের রুচিসম্মত শাড়ির পাশাপাশি শাহজাদপুর, বেলকুচি, উলাপাড়ায় তাঁতে উৎপাদিত শাড়িরও জুড়ি নেই।
এসব এলাকার কাপড়ের হাট তথা কারখানা ঘুরে-ঘুরে বৈশাখী শাড়ি সংগ্রহ করছেন কলকাতার নতুন বাজারের শাড়ির ব্যাপারি সঞ্জিত টেক্সইলের রবি শংকর, সুকান্ত পাপ্পু বসাক, নবদিপের নারায়ণ বসাকসহ শতাধিক ব্যাপারিরা।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদের শামছুলের কারখানায় কর্মরত শ্রমিক সবুজ আলী জানান, শাড়ির ব্যাপক চাহিদা থাকায় তারা সকাল থেকে গভীররাত পর্যন্ত কাজ করছেন।
বৈশাখের শাড়ি ও তাঁত ব্যবসায়ী লাবু খান বলেন, মার্চ মাসের শুরু থেকে পহেলা বৈশাখের আগের রাত পর্যন্তও চলে প্রিন্টিংয়ের কাজ। ঢাকার গাউছিয়া, ইসলামপুর, টাঙ্গাইলের করটিয়া, পঞ্চগড়ের আটোয়ারী, পাবনার আতাইকুলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে তার কারখানার শাড়ি নিয়ে যান।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদের শামছুল আলম, লাবু খান, আব্দুল হান্নান ও শাহ আলমসহ বৈশাখী শাড়ি তৈরির ব্যবসায়ীরা জানান, শাড়ি তৈরির জন্য তারা নরসিংদীর বাবুরহাট এলাকা থেকে গজ হিসেবে সাদা কাপড় কিনে আনেন। পরে ওই কাপড়ে প্রিন্টিংয়ের কাজ করে বাজারে তোলেন। তবে শাড়িতে চাহিদা অনুযায়ী ডুগি-তবলা, ঢোল, একতারা-দোতারা, মাছ ধরার পলো, ইলিশ মাছ, কাঁঠাল, শাপলা ফুল নানা চিত্র ও নকশা ফুঁটিয়ে তোলা হয়।
তারা জানান, পহেলা বৈশাখের মৌসুমে স্থানীয় নারী ও পুরুষ শ্রমিক ছাড়াও নিজ বাড়ির লোকজনকে দিয়েও কাজ করান তারা।
শাড়ি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান সাহা টেক্সটাইলের কর্ণধার কান্তি সাহা জানান, ১৯৭০ সালে দেশে যখন অরাজক পরিস্থিতি তখন আমরা নোয়াখালীর মাইজদি থেকে সপরিবারে ভারত চলে যাই। এরপর সেখানে লেখাপড়া শেষ করে পারিবারিকভাবেই শুরু করি শাড়ি তৈরির ব্যবসা। আমার শাড়ি ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের বাঙালিদের কাছে অনেকটা সমাদৃত। তবে আমার সোনার বাংলা আসলেই খাঁটি। সিল্কে আমরা এগিয়ে থাকলেও এখানকার উৎপাদিত সুতি শাড়ি পৃথিবী সেরা।
এনায়েতপুর খামার গ্রামের সফল তাঁত ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন লাবলু জানান, দেশের পাশাপাশি ভারতে বৈশাখী শাড়ির চাহিদা বেড়েছে। তাই দিন-রাত কাজ চলছে আমার কয়েক কারখানায়। ঢাকা, চট্টগ্রামের বড় বড় বিপণি বিতানের চাহিদা মিটিয়ে প্রতি সপ্তাহে হাজারখানেক করে ১২শ থেকে ১৫শ টাকা পাইকারি দরে শাড়ি ভারতের কান্তি সাহা, রবি শংকর, শুকান্ত পাপ্পু বসাকের মতো ব্যাপারিরা কিনে নিচ্ছেন। চলতি মৌসুমে গত দেড় মাস থেকে শুরু হওয়া এই ব্যবসা আরও ৮/১০ দিন চলমান থাকবে। এরপর মাঝখানে দুই সপ্তাহ বিরতি দিয়ে একটানা দুর্গাপূজা মৌসুম পর্যন্ত ভারতের ব্যাপারিরা আমাদের কাছ থেকে শাড়ি সংগ্রহ করবেন।
এ ব্যাপারে হাজী সফিকুল ইসলাম জানান, গুণগতমান ভালো হওয়ায় এনায়েতপুরের শাড়ি-লুঙ্গি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। তবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ভারতের মতো বাজার সৃষ্টি করতে পারলে ব্যবসায়ীরা আরও লাভবান হবে। এজন্য সরকারকে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির জুনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জিহাদ আল ইসলাম বলেন, বাঙালির সার্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখকে আরও রঙিন করে তুলছেন সিরাজগঞ্জের তাঁতীরা। এটা বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি সিরাজগঞ্জের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত ইতিবাচক।
এমএএস/এমএস