তাঁতশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিলেও নানা সমস্যায় জর্জরিত সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর তাঁত কাপড়ের হাট। দেশের অন্যতম বৃহৎ এ কাপড়ের হাটটি এখন মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। একদিকে মামলায় জর্জরিত হাট কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন। অপরদিকে প্রভাবশালী ইজারাদারদের নিকট জিম্মি হয়ে পড়েছেন এ হাটের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় ১০ হাজার তাঁতী এবং তাঁত কাপড় ব্যবসায়ী।
তাঁত কাপড় ব্যবসায়ীদের দাবি, সব মামলার নিষ্পত্তি ঘটিয়ে এনায়েতপুর কাপড়ের হাটটি সমিতির নামে ইজারা দিলে সরকারের রাজস্ব পরিশোধ করার পরও প্রমিন্যান্স টেক্সটাইল কোম্পানির বিনিয়োগকৃত অর্থ সমিতিই ফেরত দিতে পারবে। তবে সরকারি কোষাগার থেকে বিনিয়োগকারী কোম্পানিকে টাকা ফেরত দেয়ার প্রয়োজন হবে না বলেও মনে করছে সমিতি কর্তৃপক্ষ।
এনায়েতপুর হাট তাঁত-কাপড় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের পক্ষ থেকে মামলা নিষ্পত্তি করার মাধ্যমে তাঁত কাপড় ব্যবসা সম্প্রসারণের আদেশ চেয়ে প্রধানমন্ত্রী ও ভূমিমন্ত্রী বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
গত ৪ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরে প্রেরিত লিখিত আবেদনে এনায়েতপুর হাট তাঁত-কাপড় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি নজরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, তাঁতশিল্পের বিকাশ ও ক্ষুদ্র তাঁত কাপড় ব্যবসায়ীদের ব্যবসা প্রসারের লক্ষ্যে জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় নিবন্ধিত এ সমিতি গঠন করা হয়। এনায়েতপুর হাট সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য ওই সময় তৎকালীন সদিয়া চাঁদপুর ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী এনায়েতপুর হাটে ব্যবসারত প্রমিন্যান্ট টেক্সটাইলস্ লিমিটেড কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিপত্র করেন।
২০০৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চৌহালী উপজেলা মাসিক সমন্বয় কমিটির সভায় এনায়েতপুর তাঁত কাপড়ের হাটের জায়গা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অব্যবহৃত নিচু জায়গা পেরিফেরিতে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাশ করা হয়।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে গভীর খাদ ভরাটের জন্য অনুমোদন দেন ভূমি মন্ত্রণালয়। ওই বছরই বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান প্রমিন্যান্ট টেক্সটাইলস্ লিমিটেড কোম্পানি নিজ অর্থায়নে গভীর খাদ ভরাট করে হাটের জায়গা সম্প্রসারণ করে। তবে হাটের জায়গা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে প্রমিন্যান্ট টেক্সটাইলস্ লিমিটেড কোম্পানির বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার জন্য এনায়েতপুর হাট তাঁত-কাপড় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ১০ হাজার তাঁত কাপড় ব্যবসায়ী চুক্তিবদ্ধ হয়।
আবেদনপত্রে আরও বলা হয়, হাটটি পেরিফেরিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে জেলা প্রশাসন দরপত্র বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ইজারা দিচ্ছে। তবে বিনিয়োগকারী কোম্পানির বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত দিতে কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে প্রমিন্যান্ট টেক্সটাইলস্ লিমিটেড কোম্পানি তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য এনায়েতপুর হাট বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, ভূমি মন্ত্রণালয়, সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও অন্যান্যদের বিবাদী করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিটের শুনানি শেষে আদালত ২০০৮ সালের ১৯ আগস্ট আবেদনকারীর দাবি সেটেল করে টাকা ফেরত দেয়ার আদেশ দেন। কিন্তু জেলা প্রশাসক ওই আদেশের বিরুদ্ধে এক বছর ৪ মাস পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল ফাইল করেন।
লিখিত আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এনায়েতপুর হাটের নিয়োগকৃত ইজারাদার ও তার প্রভাবশালী সহযোগীরা হাটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর প্রতিনিয়ত উৎপাত ও অবৈধভাবে হাটের জায়গা দথল করে ব্যক্তিগত কার্যালয় নির্মাণ করেন। বাধ্য হয়ে সমিতির পক্ষ থেকে অবৈধ দখলমুক্ত করার দাবিতে একটি পিটিশন দায়ের করা হয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করলে শুনানি শেষে বিচারক দখলদারদের উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করেন। ওই আদেশ আংশিক কার্যকর হলেও এখনও বেআইনিভাবে হাটের জায়গা দখল করে ব্যক্তিগত কার্যালয় নির্মাণ করে বিভিন্ন কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন কতিপয় প্রভাবশালী।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মামলা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এনায়েতপুর তাঁত কাপড়ের হাটটি মুখ থুবড়ে পড়ছে। আবাসিক হোটেল না থাকায় দূর থেকে আসা ব্যবসায়ীরা বিড়ম্বনায় পড়ছেন। এলাকার তাঁত মালিক-শ্রমিক ও কাপড় ব্যবসায়ীরা অবিলম্বে এনায়েতপুর তাঁত কাপড়ের হাটের বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরত দিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে এ হাটের উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁতশিল্পের বিকাশ তরান্বিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে এনায়েতপুর হাট তাঁত-কাপড় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি নজরুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আমাদের আবেদনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। ওই প্রস্তাব গ্রহণ করলে সরকারি কোষাগারে বিপুল অর্থ জমা হওয়ার পাশাপাশি লাইসেন্স ফি বাবদও প্রতি বছর সরকার অর্থ পেতে পারে।
ইউসুফ দেওযান রাজু/আরএআর/এমএস