দেশজুড়ে

অবশেষে বাবার কোলে ফিরল সেই মাইশা

অস্পষ্ট ঠিকানা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তির তিন ঘণ্টা পর মারা যায় শিশুটির মা। মরদেহের সঙ্গে থাকা একমাত্র স্বজন তখন তিনবছর বয়সের শিশু মাইশা। নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার স্বামীর ঠিকানা ছাড়া অন্য কোনো তথ্যও ছিল না ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে। বেওয়ারিশ মরদেহ সঙ্গে অবুঝ শিশু নিয়ে বিপাকে পড়ে হাসপাতালের কর্মকর্তারা।

অবুঝ শিশুটির আশ্রয় ও দায়ভার নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রচার হওয়ার পর দেশ বিদেশের অনেকে দত্তক নিতে আগ্রহী হয়। পত্রিকায় ছবি দেখে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হয় শিশুটির ভাই সোহাদ (১০)। পরে সেই তাদের বিস্তারিত ঠিকানা দেয়।

সমস্ত ঠিকানা যাচাই বাছাই শেষে বাবা এস এম সোহাগকে খবর দিলে ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাবাকে ফিরে পায় মা হারা শিশুটি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফরিদপুরের জেলা প্রশাসন মাইশাকে বাবার কাছে হস্তান্তর করে।

বাবার কাছে শিশুটি হস্তান্তরের সময় এক হৃদয় বিদারকের দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। গত তিনদিন হাসপাতালের সেবিকা সাজেদা বেগমের আশ্রয়ে থাকা শিশুটি কোল থেকে কোনোভাবেই নামতে চাইছিল না। শিশুটি চিৎকার করে বলছিল আমার মা হাসপাতাল থেকে হারিয়ে গেছে। এসময় উপস্থিত কেউই অশ্রু সংবরণ করতে পারেনি।

শিশু মাইশা ওরফে সোহানা ও তার ভাই সোয়াদর জন্য জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নতুন পোশাক এবং বিভিন্ন উপহার সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে দুজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি শিশুটির মা তানজিলা সৌখিনকে (৩০) অসুস্থ অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে যান। মায়ের সঙ্গে আসে তিন বছরের ওই শিশু।

হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের ১৮ নম্বর শয্যায় ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে আসার মাত্র তিন ঘণ্টা পর শিশুটির মা তানজিলা মারা যান।

এরপর শিশুটিকে নিয়ে বিপাকে পড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শিশুটির কোনো পরিচয় বা সঠিক ঠিকানা না পেয়ে ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা সমাজ সেবা অফিস ওই হাসপাতালের সেবিকা সাজেদা বেগমের কাছে রাখে মাইশাকে। গত দুই দিন ধরে প্রশাসন বিভিন্ন স্থানে খোঁজ খবর করে শিশুটির বাবা ও আত্মীয়দের সন্ধান পায়।

মঙ্গলবার বিকেলে শিশুটির বাবা নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকার বাসিন্দা এস এম সোহাগ ফরিদপুরে আসেন। এর আগেই মাইশা ও তার ভাই সোয়াদকে (১০) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।

জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া ও শহর সমাজ সেবা কর্মকর্তা নুরুল হুদা দীর্ঘ সময় এস এম সোহাগ ও তার আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে পরিচয় নিশ্চিত হয়ে শিশুটিকে বাবার কাছে ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এরাদুল হক, এনডিসি পারভেজ মল্লিক, সাংবাদিক পান্না বালা,  হাসানউজ্জামনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাবা এস এম সোহাগ জানান, হয়রানিমূলক একটি মামলায় গত দেড় বছর কারাগারে থাকায় আমি স্ত্রী ও সন্তানদের কোনো খোঁজ নিতে পারিনি।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের আমার ভাড়া করা বাসার সমস্ত মালামাল বিক্রয় করে বছর খানেক সংসারের খরচ চলেছে। কোনো উপায় অন্তর না পেয়ে আমার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে আমার শ্বশুরবাড়ি ফরিদপুরে শিবরামপুরে চলে আসে। সেখান আশ্রয় না পেয়ে ফরিদপুর শহরের আসে কাজের সন্ধানে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সে মানবেতর জীবন কাটাতে থাকে। এক পর্যায়ে আমার ছেলে সোয়াদকে মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ দেন মো. আজাদ নামের এক ব্যক্তি।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, অসহায় শিশু মাইশার ঠিকানা পেতে আমরা বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তার বাবার কাছে লিখিত ভাবে মা হারা এই শিশুটিকে তুলে দেয়া হয়।

এফএ/আরআইপি