দিনাজপুরে এখন যে দিকেই চোখে যায় সেদিকেই দেখা যায় থোকায় থোকায় লিচু। এ যেন এক সবুজ ফলের সমারোহ। এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশে পড়তে হয়নি লিচু চাষিদের। তাই লিচু চাষিরাও এবার স্বপ্ন দেখছেন রেকর্ড পরিমাণ লিচু উৎপাদনের।
তবে ঝড় ও শিলা বৃষ্টি হলে অপরিপক্ক লিচু ফেটে পচন দেখা দিতে পারে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে লিচু রাজ্য হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরে এবার হাজার কোটি টাকার লিচু উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
দিনাজপুর কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, দেশের মানুষের কাছে রসগোল্লা হিসেবে পরিচত লিচু চাষে দিনাজপুরে রীতিমত বিপ্লব ঘটেছে। ২০১২ সালে দিনাজপুরে এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হতো। যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে এসে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ১৮০ হেক্টরে। শতকে এক করে হিসাবে হেক্টরে ২৪৭টি লিচু গাছ হয়ে থাকে। সে অনুযায়ী দিনাজপুরে এবার ১০ লাখ ৩২ হাজার ৪৬০টি গাছে লিচুর ফলন হয়েছে। গড়ে প্রতিটি গাছে চার হাজার করে করে লিচু হিসাবে ৪১ কোটি ২৯ লাখ ৮৪ হাজারটি লিচু উৎপাদন হবে। প্রতি ১০০ লিচুর দাম মাদ্রাজি-২০০ থেকে ৪০০, বোম্বাই-২০০ থেকে ৪০০, বেদানা-৭০০-১১০০ ও চায়না –থ্রি-৬০০-১১০০ গড় মূল্য হিসাবে এক হাজার তিন কোটি ৬৬ লাখ ছয় হাজার ৬৬৭ টাকার লিচু উৎপাদন হবে।
জেলা তথ্য বাতায়ন সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর জেলায় লিচু উৎপাদনে প্রতি একরে সার নিড়ানি, সেচ ও বালাই নাশকে খরচ হয় ৩৫ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ হয় তিন লাখ টাকা। দিনাজপুরে মাদ্রাজি ৩০%, বোম্বাই ৩৯%, বেদানা ৫%, চায়না থ্রি ২৫%, কাঠালী বোম্বাই ১%, জমিতে চায় হয়। মোট উৎপাদনের ২০% দিনাজপুর জেলায় ও ৮০% দেশের বিভিন্ন জেলাসহ বিদেশে বিক্রি হয়ে থাকে।
দিনাজপুর জেলার মধ্যে সদর উপজেলার কসবা, মাসিমপুর, সৈয়দপুর, মাহমুদপুর, নশিপুর ও জয়দেবপুর, বিরল উপজেলার মাধববাটি, রসুল শাহপুর, রানীপুকুর, মঙ্গলপুর, মাটিযান দিঘী, আজিমপুর, লক্ষ্মীপুর, জগতপুর ও রাজুরিয়া, বীরগঞ্জ উপজেলার চাকাই, কল্যাণী, পাল্টাপুর, ধূলাউড়ি, মরিচা ও শিবরামপুর, চিরিরবন্দর উপজেলার গলাহার, আরজি গলাহার, কাদরা, কিষানপুর, জয়দেবপুর ও বিরামপুর উপজেলার শিমুলপুর, দুর্গাপুর, মামুদপুর ও মির্জাপুর লিচু উৎপাদনের জন্য উল্লেখযোগ্য।
সদরের কালিতলা, মাসিমপুর, পুলহাট বিরলের মাধববাটি, চিরিরবন্দরের মাদারগঞ্জ ও বীরগঞ্জের বীরগঞ্জ হাট ও বিরামপুরের বিরামপুর বাজারে লিচু বিক্রির বাজার বসে।
দিনাজপুরের লিচুর মধ্যে চায়না থ্রি, বেদেনা, বোম্বাই ও মাদ্রাজি, কাঠালী উল্লেখয্যেগ্য। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে এবার এসব প্রজাতির লিচুর বাম্পার ফলনের আশা করছেন চাষিরা।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিনাজপুরের প্রতিটি বাড়ির বসতভিটায় বা আঙ্গিনার লিচু গাছে থোকায় থোকায় লিচু ঝুলছে। চাষিরা বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত। রাত জেগে বাগান পাহারা দিচ্ছেন।
মাসিমপুর এলাকার লিচু চাষি নজরুল ইসলাম জানান, লিচুর ফুল আসা শুরু হওয়া থেকে বাগানের পরিচর্যা শুরু হয়েছে। নিয়মিত স্প্রে করা হচ্ছে। তবে এবার আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে সেচ দেয়ার প্রয়োজন হয়নি। রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার লিচু ব্যবসায়ীরা আসতে শুরু করেছেন। তারা আগাম লিচু বাগান ক্রয় করছেন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা সাফায়েত হোসেন জানান, কৃষি কর্মকর্তারা চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কোন সময়ে কোন কীটনাশক, বালাইনাশক ব্যবহার করা উচিত সে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফ জানান, চলতি বছরে দিনাজপুর জেলায় চার হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
তিনি বলেন, এবার আগাম ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত যে অনুকুল পরিবেশ বিরাজ করছে তা লিচুর জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে ঝড় ও শিলা বৃষ্টি হলে লিচুতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
আরএআর/জেআইএম