দেশজুড়ে

একই ব্যক্তির চার স্ত্রীকে ভিজিডি ও ফেয়ার প্রাইজ কার্ড!

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের চর নতুন বন্দর এলাকার এনসার আলীর চার স্ত্রী। দুই স্ত্রীর নামে দেয়া হয়েছে ভিজিডি এবং দুই স্ত্রীর নামে দেয়া হয় ফেয়ার প্রাইজ কার্ড। আছিয়া খাতুনের নামে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড নম্বর-২০৩২, ফুলু খাতুনের নামে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড নম্বর-২১০৭ এবং লাভলী আক্তারের নামে ভিজিডি কার্ড নম্বর-৪১৮ এবং মরিচা খাতুনের নামে ভিজিডি কার্ড নম্বর-৪১০।

ফুলবাড়ী গ্রামের আলতাফের ১১ বিঘা জমি আর সাত কক্ষ বিশিষ্ট আধা পাকা বিল্ডিং থাকলেও তার স্ত্রী এজেদার নামে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড দেয়া হয়। এর নম্বর-২০৩১।

রৌমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নে দরিদ্র মানুষদের ভাগ্য উন্নয়নে নেয়া সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এমনই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগে ভিজিডি, ফেয়ার প্রাইজ ও কর্মসৃজন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়। ভিজিডি কার্ড প্রতি ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা, ফেয়ার প্রাইজ কার্ডে ২ হাজার টাকা, কর্মসৃজন প্রকল্পে নতুন নাম অন্তর্ভুক্তিতে ৩ হাজার এবং পুরাতন নাম অন্তর্ভুক্তিতে ২ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হচ্ছে উপকার ভোগীদের।

এছাড়া ঢেউটিন বিতরণ ও সেলাই মেশিন বিতরণেও নেয়া হয় ভাগ। এ হিসাবে শুধুমাত্র ৫নং ওয়ার্ডে সরকারি সহায়তা দিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকার উৎকোচ বাণিজ্য করা হয়।

লিখিত অভিযোগ ও তথ্য অনুসন্ধান করে দেখা যায়, টাকার বিনিময়ে এবং স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে এসব অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেন রৌমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শালু। চেয়ারম্যান ও ইউপি পরিষদের মেম্বারদের যোগসাজসে এ অপকর্ম চালিয়ে গেলেও দেখার কেউ নেই।

ডিগ্রী চর গ্রামে আনোয়ার চেয়ারম্যানের কাছের মানুষ হওয়ায় একই পরিবারের ৫ জনকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। আনোয়ারের নামে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড নম্বর-২১৩৩, মেয়ে আকতারা খাতুন জামালপুরে শ্বশুর বাড়িতে থাকলেও এই নামে ভিজিডি কার্ড নম্বর-৪৬৭।

ছেলে শাহা আলমের নামে কর্মসৃজনের কার্ড নম্বর-২১৭৯, নাতী শাহিনুরের নামে কার্ড নম্বর-২১৪৮ এবং নাতনী ছাবিয়া খাতুনের নামে কর্মসৃজনের কার্ড নম্বর-২১৩৪। উত্তর ইজলামারী গ্রামের বাবুল মিয়া সৌদিতে কর্মরত থাকলেও তার নামে কর্মসৃজন কাজের কার্ড নম্বর-২৫৩।

ফুলবাড়ী গ্রামের রহমত উল্লাহ`র পরিবারে সরকারি নিয়ম নীতি লংঘন করে ৪টি সরকারি সেবা দেয়া হয়। রহমত উল্লাহর নামে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড নম্বর-২০৪২, তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুনের নামে ভিজিডি কার্ড নম্বর-৪২৫ এবং পুত্র রমিছের নামে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড নম্বর-২০৪১।

এছাড়াও রহমত উল্লাহর নামে ঢেউটিন বরাদ্দ এবং ছেলের স্ত্রীর নামে সেলাই মেশিন দেয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

চর ফুলবাড়ী গ্রামের ফুল মিয়া ও জোবেদ আলী অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র টাকা না দেয়ার কারণে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাদের গ্রামের হতদরিদ্র ৪০টি পরিবারের একই হাল বলে জানান। সাবলুর স্ত্রী জেলেখা ভিজিডি কার্ডের জন্য মেম্বারকে ৪ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেন।

মন্টু মিয়ার স্ত্রী মাহফুজা ফেয়ার প্রাইজ কার্ডের জন্য উৎকোচ দেন ২ হাজার টাকা, জহুরা কর্মসৃজন কাজের জন্য ২ হাজার টাকা এবং আমজাদ কর্মসৃজন কাজে নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ৩ হাজার টাকা উৎকোচ দেন বলে দাবি করেন।

রৌমারী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার জোনাব আলী বাদশা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রহমত উল্লাহ্ পঙ্গু হওয়ায় তার ছেলে-মেয়ের পড়াশুনা চালিয়ে যেতে একাধিক সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হয়। মূলত ভিজিডি, ফেয়ার প্রাইজ, কর্মসৃজন কর্মসুচি, সেলাই মেশিন ও ঢেউটিন প্রদান করার ক্ষমতা চেয়ারম্যানের হাতে।

এ ওয়ার্ডে ভিজিডি কার্ড ১০০টি, কর্মসৃজন কার্ড ১০৬টি, ফেয়ার প্রাইজের কার্ড ৩৭০টি, সেলাই মেশিন ১৪টি এবং ৬ জনকে ঢেউটিন ও নগদ ৩হাজার টাকা দেয়া হয়।

রৌমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শালু উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করলেও একই পরিবারে একাধিক সদস্যের নামে ভিজিডি, ফেয়ার প্রাইজ, কর্মসৃজন প্রকল্পের সুবিধা দেয়ার কথা স্বীকার করেন।

তিনি দাবি করেন, ইতোপূর্বে বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে ফেয়ার প্রাইজের ১৬২টি কার্ডের নাম পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে। অন্যদের ব্যাপারে অভিযোগ আসলে পরবর্তীতে ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

এফএ/এমএস