নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চলছে জোড়াতালি দিয়ে। নতুন স্থাপিত দুটি জেনারেটরের মধ্যে একটি এক বছর যেতে না যেতেই বিকল হয়ে পড়েছে। ফলে পুরনো ও নতুন মিলে দুটি জেনারেটর দিয়ে গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে কৃর্তপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পাশপাশি নিন্মমানের জেনারেটর স্থাপন করায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
মেঘনা নদী বেষ্টিত নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জনসংখ্যা পাঁচ লাখের অধিক। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ও আমেরিকা থেকে ছোট বড় ছয়টি জেনারেটর এনে এ উপজেলা সদরের মুষ্টিমেয় কিছু গ্রাহককে বিদ্যুৎ দেয়ার ব্যবস্থা করে সরকার। কিন্তু জেনারেটরগুলো ডিজেল চালিত হওয়ায় এবং ধীরে ধীরে পুরনো হয়ে যাওয়ার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। বিচ্ছিন্ন এ দ্বীপ উপজেলার মানুষ নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে নানা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানায়, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা এবং বিকেলে ৪টা থেকে রাত একটা পর্যন্ত বিদ্যুত দেয়ার কথা থাকলে ও সেটি তারা ঠিক মতো পায় না। বেলা ১১টা থেকে ১২টা আর সন্ধ্যায় ও দুই এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান। এতে দিনে যেমন তেমন ভাবে চললেও রাতে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করার সময়। অথচ তখন চলে লোডশেডিং।
এর ফলে প্রশাসনিক স্বাভাবিক কাজকর্মেও স্থবিরতার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চরম লোকসান গুনতে হয়। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে এবং ভিশন টুয়েন্টি ওয়ান বাস্তবায়নে হাতিয়ায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি স্থানীয়দের।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, হাতিয়ায় অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা লোডশেডিংয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব রিকশা চলাচল করলেও তারা কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে না।
হাতিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের সরকারি প্রকৌশলী মশিউর রহমান জাগো নিউজকে জানান, পুরনো ছয়টি জেনারেটরের মধ্যে তিনটি পুরোপুরি বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। দুটি মেরামতযোগ্য হলেও তা পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। একটি দিয়ে কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরবরাহ করে আসছিলো।
২০১৬ সালের ৯ ফ্রেব্রুয়ারি ইংল্যান্ড থেকে পারকিনস নামক ৫০০ কেভির দুটি জেনারেটর এনে বসানো হয়। স্থাপিত নতুন দুটি জেনারেটর থেকে (৪০০+৪০০)=৮০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে উপজেলার ওছাখালী সদরের পৌর এলাকা, উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে দুই হাজার ১০৩ জন গ্রাহককে দিনে দুই বার বিদ্যুৎ দিয়ে আসছিল।কিন্তুু সেখানে তাদের লোডশেডিং করতে হয়। চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ার কারণে এক ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং দেয়া হয়।
এদিকে নতুন বসানো দুটি জেনারেটরের মধ্যে একটি গত ডিসেম্বর মাসে বিকল হয়ে পড়ে। ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের নয় মাসের মাথায় একটি বিকল হয়ে পড়ায় ৩০ মার্চ জেনারেটর দুটি শাটডাউন দেয়া হয়। কিন্তু তারপরেও এটি আর সচল হয়নি। ফলে পুরনো একটি ও নতুন একটি জেনারেটর থেকে প্রায় পাঁচশত কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। জোড়াতালি দিয়ে এভাবে প্রতিদিন বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে গ্রাহকেরা তাদের ওপর ক্ষুদ্ধ।
হাতিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুব মোর্শেদ জানান, ডিজেল চালিত দুটি জেনারেটর স্থাপনে ব্যাপক দুর্নীতি করা হয়েছে। নিম্মমানের জেনারেটর দুটি স্থাপনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের ছাড়পত্রে আপত্তি জানানোর পরও ঠিকাদারকে বিল দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালনা ও সংরক্ষণ নোয়াখালী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মোফাজ্জল হোসেন জাগো নিউজকে জানান, প্রায় দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে হাতিয়ায় ২০১৬ সালে নতুন দুটি জেনারেটর বসানো হয়। ওই সময়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
কিন্তু তিনি ছাড়পত্রে স্বাক্ষর না করে অবসর গ্রহণ করেন এবং কানাডায় চলে যান। পরবর্তীতে তাকে প্রধান করে আবার চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয় এবং তারা দেখে শুনে জেনারেটর দুটি স্থাপনের ছাড়পত্র দেন এবং ঠিকাদার তার বিল তুলে নেন।
এটি যেহেতু ইংল্যান্ডের তৈরি সেহেতু নিন্মমানের হতে পারে না বলে তিনি আরো জানান, ছোট খাট সমস্যা হলে ওয়ারেন্টি সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষের তা মেরমাত করে দেয়ার কথা রয়েছে।
এফএ/জেআইএম