সোমবার সময় তখন ১২টা। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বসার আগে এজলাসে আসা সবাইকে বের করে দেয়া হলো। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে বিচারপ্রার্থী অনেকে প্রশ্ন চোখে নিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছেন। একটু পরে কাটগড়ায় আসলেন কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন।
বিচারকের আসনে বসলেন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৌফিক আজিজ। দরজা বন্ধ করে অনেকটা গোসপনীয়তা নিয়ে শুরু হয় মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষতিপূরণের ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার শুনানি। দীর্ঘ ১৫ মিনিট শুনানি শেষে বিচারক আত্মসাতে অভিযুক্ত কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিনের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মো. রুহুল আমিন বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের উপ-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কক্সবাজার আদালতের প্রসিকিউটর মো. সিরাজউল্লাহ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমরা আদালতকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, দেশের ইতিহাসে মাতারবাড়ির ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ একটি কলঙ্কিত ও আলোচিত ঘটনা। ভুয়া কাগজপত্র উপস্থাপন করে ৪৬ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের আয়োজন করে তৎকালীন ডিসি রুহুল আমিন, এডিসি (রাজস্ব) জাফর আলমসহ ৩৬ জনের একটি চক্র।
তারা প্রথম ধাপে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। বাকি টাকা তুলতে ৫টি চেকও ইস্যু করে সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে দুদক তদন্তে নেমে ইস্যু হওয়া চেকগুলো উত্তোলন স্থগিত করে দেয়। পরে প্রমাণ হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের অভিযুক্ত করে মামলা করে দুদক।
এ মামলায় চক্রের মূল হোতা কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার সাবেক উচ্চমান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদার, সার্ভেয়ার ফখরুল ইসলাম ও সাবেক এডিসি জাফর আলম কারান্তরিণ রয়েছেন। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তরা ছাড় পেয়ে গেলে অন্যরা বেশি দুর্নীতি করার সাহস পাবে। প্রায় ১৫ মিনিট শুনানি শেষে কাড়গড়ায় থাকা আসামির জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করার আদেশ দেন। আদালতের এ আদেশে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
এরপরই সাবেক জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিনকে এজলাস কক্ষ থেকে বের করে কারাগারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। অতিগোপনে হলেও বিষয়টি একান থেকে ওকানে গিয়ে প্রকাশ পাবার পর আদালত পাড়ায় ভিড় জমান গণমাধ্যমকর্মীসহ উৎসুখ জনতা।
সাদা শার্ট ও কালো প্যান্টে ইন করা পরিপাটি রুহুল আমিনকে দু’পাশ থেকে ধরে গাড়িতে তুলতে আনছিলেন দু’পুলিশ সদস্য। তখন ছবি তুলতে চাইলে মুখে পত্রিকা দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন তিনি। সেভাবেই কারাগারের গাড়িতে উঠে যান অভিযুক্ত সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের উপ-সচিব মো. রুহুল আমিন।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক বজলুর রশিদ আকন্দ বলেন, বেলা দেড়টার দিকে সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের উপ-সচিব মো. রুহুল আমিনকে বহনকারি গাড়িটি কারাগারে আসে। তাকে রিসিভ করে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে মিনিট পনের সময় লাগে আমাদের। নিয়মানুসারে তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে আদালত সূত্র জানায়, দুদকের দায়ের করা মামলাটি প্রাথমিকভাবে প্রমাণের পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জসিট দেয়া হয়। এরপর থেকে অভিযুক্তদের আটক অভিযান চলে। চলতি বছরের তিন এপ্রিল প্রধান অভিযুক্ত উচ্চমান সহকারী আবুল কাশেম ও সার্ভেয়ার ফখরুল গ্রেফতার হলে ৪ এপ্রিল মহামান্য হাইকোর্ট থেকে ৬ সপ্তাহের জন্য আগাম জামিন নিয়েছিলেন সাবেক জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের উপ-সচিব মো. রুহুল আমিন।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে সোমবার (২২ মে) তিনি চুপিসারে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। সকালে তার পক্ষ হয়ে কক্সবাজারের আইনজীবী অ্যাড. নুর সুলতান এবং অ্যাড. রণজিৎ দাশসহ ৪/৫ জন তার জামিন আবেদন করেন।
আর দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রসিকিউটর মো. সিরাজউল্লাহকে সহযোগিতা করেন দৃদকের আইনজীবী অ্যাড. আব্দুর রহিম।
দুদকের দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদক চট্টগ্রাম-২ এর উপ-পরিচালক ছৈয়দ আহমদ বলেন, মহেশখালীর মাতারবাড়িতে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের চলমান কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির বিপরীতে ২৩৭ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। এর মাঝে ২৫টি অস্তিত্বহীন চিংড়ি ঘের দেখিয়ে ৪৬ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার ৩২০ টাকা ক্ষতিপূরণ নিজেদের করায়ত্বে নেয় কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ শাখার উচ্চমান সহকারী আবুল কাশেম মজুমদারের নেতৃত্বে ৩৬ জনের একটি সিন্ডিকেট।
এ থেকে কৌশলে তারা ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৮ হাজার ৩১৫ টাকা উত্তোলনও করে ফেলে। বাকি টাকার জন্য ইস্যুকরা হয়েছিল আরো ৫টি চেক। এরই মধ্যে নালিশ আসলে ৫টি চেকের আওতায় নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের বাকি টাকা আটকে দেয়া হয়।
এ দুর্নীতিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের উপ-সচিব মো. রুহুল আমিন, সাবেক এডিসি (রাজস্ব) জাফর আলমসহ অনেকের মৌন সমর্থন ছিল। তারা নির্দিষ্ট একটি অংক নিজেরা গ্রহণও করেছে বলে প্রাথমিক ভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকিটা আদালতে উপস্থাপন করবে দুদক।
অপরদিকে, অভিযুক্ত আবুল কাশেম, সাবেক ডিসি রুহুল আমিন, এডিসি জাফর ও সাভেয়ার ফখরুল কারান্তরিণ হবার খবরে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীরা আতংকে রয়েছে বলে প্রচার পায়। ইতোমধ্যে গ্রেফতার এড়াতে বিভিন্ন জায়গায় তারা দৌঁড় ঝাপও শুরু করেছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে খবর এসেছে।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জেআইএম