দেশজুড়ে

মধুপুর-ঘাটাইলের সাড়ে ৫ হাজার খামারের মধ্যে নিবন্ধিত মাত্র ৭শ

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারি গার্মেন্টস শিল্পের পর দেশের পোল্ট্রি শিল্প একটি উল্লেখযোগ্য খাত। পোল্ট্রি শিল্প একদিকে যেমন আমিষ ও প্রোটিনের চাহিদা মেটাচ্ছে অন্যদিকে অসংখ্য শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বেকার যুবকের জন্য সৃষ্টি করেছে কর্মসংস্থান।

তবে এ শিল্পের খামার স্থাপন থেকে শুরু করে ডিম ও মাংস বিক্রি পর্যন্ত রয়েছে নানা সমস্যা আর অনিয়ম। এছাড়াও এ শিল্পের অধিকাংশই রয়েছে অনিবন্ধিত। যার ফলে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

অধিকাংশ অনিবন্ধিত তালিকায় রয়েছে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলা। এ দুই উপজেলার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার পোল্ট্রি শিল্পের মধ্যে নিবন্ধিত মাত্র ৭শ ১৬টি। উপজেলা প্রাণী সম্পদ কার্যালয়ের হিসাবমতে নিবন্ধন না করায় ঘাটাইল-মধুপুরের এসব খামার থেকে সরকার প্রতি ৫ বছরে গড়ে ৫ কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫ হাজার ৫শ ৩১টি পোল্ট্রি খামার রয়েছে। যার মধ্যে লেয়ার ৩ হাজার ৯০০টি এবং বয়লার খামার ৮০০টি। শুধুমাত্র ঘাটাইল উপজেলায় পোল্ট্রি খামার রয়েছে ৪ সহস্রাধিক।

এ উপজেলার মোট জনসংখ্যার ১৪ ভাগই এ পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। দেশের শুধুমাত্র ঘাটাইল উপজেলা থেকে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ২২ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। যা ২০০৭-১৫ অর্থ বছরে ছিল ৪ কোটি ৯০ লাখ। গত ৮ বছরে ডিম উৎপাদনের হার বেড়েছে ৩৫০ ভাগ। উপজেলাটির ১১ হাজার ২শ ৫৭টি পরিবার এ পোল্ট্রি শিল্পে নির্ভরশীল। তবে এ উপজেলার এত সংখ্যক খামারের মধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে মাত্র ৪৮৪টি খামার। মধুপুর উপজেলায় লেয়ার ৩৩২টি এবং বয়লার ২৯৯টি। তন্মধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে লেয়ার ৭১টি এবং বয়লার ১৬১টি।

উপজেলা প্রাণী সম্পদ কার্যালয়ের দেয়া তথ্যে জানা যায়, বেসরকারি লেয়ার খামার নিবন্ধনে ‘এ’ গ্রেডের ৫ বছরের জন্য সরকারি ফি ১৫ হাজার টাকা আর নবায়ন ফি ১২ হাজার ৫শ টাকা। ‘বি’ গ্রেডের জন্য ১০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি ৭ হাজার ৫শ টাকা। ‘সি’ গ্রেডের (১০০১-১০০০০ মোরগি) জন্য ফি ৫ হাজার টাকা, নবায়ন ফি ৩ হাজার ৫শ টাকা।

২০০৮ সালের জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক খামার ঘনবসতি এলাকা এবং শহরের বাহিরে স্থাপন করতে হবে। একটি বাণিজ্যিক খামার থেকে আরেকটি খামারের দূরত্ব ২০০ মিটার হতে হবে। ব্রিডিং খামারের পারস্পারিক দূরত্ব ৫ কি.মি. হতে হবে। গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক ও প্যারেন্ট স্টক খামারের ২ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো খামার স্থাপন করা যাবে না।

খামার স্থাপনের পূর্বে পশু সম্পদ অধিদফতরের অনুমোতি গ্রহণ করতে হবে। খামার বা হ্যাচারি স্থাপন পরিকল্পনায় উন্নত জীব নিরাপত্তা ব্যবস্থার উল্লেখ করতে হবে। খামার বা হ্যাচারি স্থাপন পরিকল্পনায় বর্জ্য স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে অপসারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং বর্জ্য অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানের সংস্থানও থাকতে হবে।

মধুপুরের নিবন্ধিত রংধনু পোল্ট্রি ফার্মের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মো.আবু জাফর জানান, বড় খামারিরা সরকারকে সুবিধা দিচ্ছে। সরকারও তাদের সহযোগিতা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত খামারিরা পোল্ট্রি খাতে কোনো ব্যাংক লোন পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।

এ সময় তিনি আরও জানান, এ এলাকার খামারিরা নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র খামার স্থাপন করছে এবং খোলা জায়গায় পোল্ট্রি বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ করছে। ঘাটাইলের রসুলপুর ও ধলাপাড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য বংশাই নদীতে ফেলে দিয়ে নদীর পানিও দৃষিত করছে।

সরেজমিনে খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খামার স্থাপন নীতিমালা কঠিন হওয়ায় অনেক খামারি সরকারের নিবন্ধন নিতে পারছেন না।

তারা জানান, বিভিন্ন সিন্ডিকেটের জন্য ছোট খামারিরা পদে পদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাচ্চা ক্রয় থেকে শুরু করে ডিম বিক্রি পর্যন্ত আয়ের ৪ ভাগের ৩ ভাগই চলে যাচ্ছে মধ্য সত্ত্বভোগিদের পকেটে। কোম্পানির সিন্ডিকেট থেকে ১০৫ টাকার বাচ্চা কিনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। আবার ঢাকার তেজগাঁও ও কারওয়ান বাজারে ডিম বিক্রেতা সমিতির সিন্ডিকেটের কারণে ডিমের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা।

অপরদিকে নিম্নমানের কোম্পানির মেডিসিন ও ভেজাল খাদ্যের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খামারি। গাজীপুরের কাশেমপুরস্থ গ্রাম বাংলা পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডের ভেজাল খাদ্যের জন্য ঘাটাইল উপজেলার সন্ধানপুর এবং রসুলপুর ইউনিয়নের ৮-১০টি খামারের মুরগি মারা যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগিরা।

গ্রাম বাংলা পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডের ডিলার মো.আবুল কালাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ভেজাল খাদ্যের জন্য আমার খামারসহ প্রায় ১০টি খামারের ৫০ লাখ টাকার মুরগি মারা গেছে। কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দেয়নি।

এ ব্যাপারে গ্রাম বাংলা পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিস ফিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রেজাউল করিম মুঠোফোনে জানান, এতগুলো মুরগি মারা যায়নি। আমি ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেব।

ধলাপাড়ার মেসার্স রকীব এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারি ও পাওয়ার ফিস ফিডের পরিবেশক মো. মাসুম সিদ্দিকী জানান, বাচ্চার সিন্ডিকেট ভাঙতে পারলে খামারিরা অনেক লাভবান হবেন।

এ ব্যাপারে কাজী ফার্মস লি. এর মার্কেটিং ম্যানেজার শ্রী সুভাস জানান, বাচ্চার দাম কত তা আমার সাংবাদিকদের বলার এখতেয়ার নেই।

ঘাটাইল উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মো.মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পোল্ট্রি শিল্প একটি উজ্জল ও সম্ভাবনাময় খাত। অনেক বেকার যুবক এ পেশায় কাজ করে সাবলম্বী হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবুল কাশেম শাহিন জানান, যারা নদীতে পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য ফেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এফএ/আরআইপি