দিনাজপুরে রাতের আঁধারে জাতীয় উদ্যান ঐতিহ্যবাহী রামসাগরের সরকারি দীঘির মাছ বিক্রির টাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে পিকনিক হয়েছে। শুধু তাই নয়, পিকনিকের পাশাপাশি আরও মাছ ধরে সেই মাছের ভাগ-বাটোয়ারাসহ শহরের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। বন বিভাগের মধ্যে মাছ ধরার ঘটনা ঘটলেও এ ব্যাপারে জানেন না বন বিভাগের কর্মকর্তারা। আর চুরি ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকার দাবি করলেও পুলিশ বলছে তাদেরকে কোন কিছুই জানানো হয়নি। জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে সদর উপজেলার ৬ নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের চেরাডাঙ্গী মৌজায় অবস্থিত জাতীয় উদ্যান রামসাগরের পুকুরে সরকারি মাছ ধরার জন্য একদল জেলেকে নামানো হয়। প্রথমে সেখান থেকে কিছু মাছ ধরে সেই মাছ বিক্রির টাকায় কয়েকটি খাসি কিনে জবাই করে ও রামসাগর থেকে উত্তোলিত মাছের ফ্রাইয়ের সঙ্গে পিকনিক খাওয়া হয়। পিকনিকে অংশগ্রহণ করা আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা জানান, এই অনুষ্ঠানে প্রশাসনের আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন কোতোয়ালী আওয়ামী লীগের সভাপতি এমদাদ আলী সরকার, আউলিয়াপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আনারুল ইসলাম আনার, শেখপুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মমিনুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা বাচ্চু, সুশান্ত মিশ্র, জয়ন্ত মিশ্র, রেজাউর রহমান, নুরুল ইসলামসহ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ, থানা আওয়ামী লীগ ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এছাড়াও এসময় পুকুরের মাছ ধরা ও বিক্রয় কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহমান, মৎস্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম, একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সহকারী ভূমি কর্মকর্তা, সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা, বন বিভাগের ২ জন কর্মকর্তা, ৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা উপস্থিত ছিলেন। রাত ৯টা থেকে ভোর পর্যন্ত ওই পুকুরে মাছ ধরা হয়। একটি সূত্র জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে রাত ৯টা থেকে ভোর পর্যন্ত কয়েক টন মাছ ধরা হয়। যার প্রতিটির ওজন ছিল সর্বনিম্ন ১৯ কেজি এবং সর্বোচ্চ ৪০ কেজি। পরে ওই মাছ তুলে আমন্ত্রিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রত্যেকের বাড়ির জন্য একটি করে দেয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নেন ১৮টি মাছ। শুধু তাই নয়, আমন্ত্রণে উপস্থিত না থাকা আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের বাড়িতেও পৌঁছানো হয় এই মাছ। পরে অবশিষ্ট মাছ নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানা যায়। ১৭৫০-১৭৫৫ সালের মধ্যে দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের চেরাডাঙ্গী মৌজায় পলাশী যুদ্ধের পূর্বে খনন করা হয় রামসাগর নামে একটি দিঘী। এই দীঘির মোট আয়ন ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ মিটার। এই পুকুরের গভীরতা গড়ে প্রায় ১০ মিটার ও পাড়ের উচ্চতা ১৩.৫ মিটার। ১৯৬০ সালে রামসাগর বন বিভাগের তত্বাবধানে নীত হয়। ২০০১ সালে রামসাগর জাতীয় উদ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় বর্তমানে রামসাগর পুকুরের মাছ উৎপাদন ও বিক্রির দায়িত্বে রয়েছে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ। একটি সূত্র জানায়, আন্তমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত আছে, জাতীয় উদ্যানের অন্তর্ভূক্ত গাছ, মাছ কিংবা পশুপাখি নিধন করা যাবে না। রামসাগরের দায়িত্বে থাকা জেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা আলী কবির জাগো নিউজকে জানান, আমরা রামসাগরে শুধুমাত্র পাড় দেখাশোনা করি। সরকারি পুকুর ও পানিতে মাছের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। মাছ ধরা কিংবা লুটপাটের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। দিনাজপুর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এনামুল হক জাগো নিউজকে জানান, মাছ ধরা ও বিক্রয় কমিটির আহ্বায়ক সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারবেন। মাছ ধরার অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না বলে জানান। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, রাত ১২টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত রামসাগর পুকুরে মাছ ধরা হয়েছে। পরে সেসব মাছ প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা হয়েছে তবে মাছের পরিমাণ জানাতে পারেননি তিনি।মাছের ভাগ-বাটোয়ারার বিষয়ে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, কোন ধরনের মাছ ভাগ বাটোয়ারার ঘটনা ঘটেনি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাছ কিনে নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রায় এক লাখ টাকারও বেশি মাছ কর্মকর্তারা ক্রয় করেছেন, যার টাকা কোষাগারে জমা করা হবে। তবে তিনি জানান, যেহেতু এটি বিশাল একটি কর্মকাণ্ড, তাই হয়তো কিছু চুরির ঘটনা হতে পারে। তবে সার্বক্ষণিক ৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ কোতোয়ালী থানার তদন্ত কর্মকর্তা আবুল হাসনাত খানসহ পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তবে কোতোয়ালী থানার তদন্ত কর্মকর্তা আবুল হাসনাত খান জাগো নিউজকে জানান, নিয়মিত টহল হিসেবে পুলিশ সদস্যরা রামসাগরে ছিল। তবে মাছ ধরার বিষয়ে তাদের কোন কিছু জানানো হয়নি। এ ব্যাপারে দিনাজপুরের সবচেয়ে বড় মাছের বাজার বাহাদুর বাজারের একাধিক মাছ ব্যবসায়ী জানান, মৎস্য ব্যবসায়ী বাহাদুর বাজারের শুলুর আড়তে নিয়ে ডাক দেয়া হয়। মাছগুলো ক্রয় করে চক বাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী সাগর। প্রায় ৪০ মণ মাছ ছিল। এই মাছ শুধু বাহাদুর বাজারে নয় শহরের চক বাজার, রেল বাজার, রামনগন বাজার, নিউটাউন বাজার, সুইহারী বাজার, পুলহাট বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে রামসাগরের মাছ বিক্রি হয়েছে। একেকটি মাছের ওজন ছিল ১৯ কেজি থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত। যা প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৪শ` টাকা দরে।দিনাজপুর জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী জাগো নিউজকে জানান, রাতে রামসাগরের কিছু মাছ ধরা হয়েছিল যা প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। প্রায় ৭ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাসহ বিভিন্ন জন মাছ নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নিলামে যে কেউ মাছ ক্রয় করতে পারেন। ক্রয়কৃত মাছ হয়তোবা তারা নিয়ে গেছেন। উল্লেখ্য, এর আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও একই কায়দায় মাছ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল এই রামসাগরে। এমদাদুল হক মিলন/এমজেড/আরআইপি