বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে প্রধান বাধা ‘অবকাঠামো সমস্যা’

প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে পুরানো বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের। দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ ভারতের সঙ্গে হয়।

তবে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্যে বেশকিছু সমস্যা বিরাজ করছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। বাড়ছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতিও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামোগত সমস্যাসহ নানাবিধ কারণে এ ঘাটতি দিন দিন বেড়েই চলছে। এসব কারণে একদিকে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অপরদিকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ থেকে।

ব্যবসায়ীদের একাধিক সূত্র জানায়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে অবকাঠামোগত সমস্যা, শুল্ক-অশুল্ক বাধা ও বন্দর সংক্রান্ত অসুবিধাগুলো উল্লেখযোগ্য। এসব কারণে রফতানি-প্রক্রিয়া জটিলতায় পড়ে। তবে দুই দেশ উদ্যোগ নিলে এসব বাধা দূর করা সম্ভব।

ব্যবসায়ীরা বলেন, ভারতে শুল্কমুক্ত পণ্য প্রবেশাধিকারে একটি বড় সমস্যা। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে তা সমাধান হলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশি পাট ও পাটজাত পণ্যের ওপর ভারত সরকার উচ্চহারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। এতে এ খাতে রফতানি কমে গেছে।

এছাড়া বর্তমানে ভারতে রফতানির ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের ওপর ৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ওপর সাড়ে ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।

শুধু শুল্কই নয়, অশুল্ক বাধাও এখনেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে একটি বড় সমস্যা বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাশেম খান জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশ এতদিন (দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) সাফটা’র আওতায় ভারতে শূন্য শুল্কে পাট ও পাটজাত পণ্য রফহানি করে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি পাট ও পাটজাত পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চহারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ভারতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার করে বিষয়টির সুরাহা জরুরি।

একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়নসহ স্থলবন্দরগুলো আধুনিকায়নের দাবি জানান তিনি।

এদিকে, আমদানি-রফতানির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য মূলত আখাউড়া-আগরতলা, মনু-কৈলাশহার, ভুরুঙ্গামারি-গোলকগঞ্জ, শেওলা-সুতারকান্দি, বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ি, বুড়িমারী-চেংরাবান্দা, তামাবিল-ডাউকি, ভোমরা-ঘোজাডাঙ্গা ও বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে হয়ে থাকে। অধিকাংশ বন্দরেই রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যা।

ব্যবসায়ীরা বলেন, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বন্দরগুলো বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব বন্দরের রাস্তাগুলো খুবই সংকীর্ণ। সীমান্তের উভয় অংশে মাত্র দুই লেনের রাস্তা। বন্দরে কোনো সেডের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি হলে লোড-আনলোডের সময় পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া কোনো যানবাহনে বিকল বা যান্ত্রিক সমস্যা হলে পেছনে থাকা সব গাড়ি আটকে থাকে।

তারা বলেন, শেডের অভাবে পণ্য সরানোর মতো কোনো জায়গা নেই। রাস্তার ওপর মালবাহী গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকে। তাই নির্বিঘ্নে গাড়ি চলাচলের জন্য বন্দরের দুই দিকে চার লেনের রাস্তা দরকার। এছাড়া আমদানি করা পণ্যের লোডিং-আনলোডিং বাংলাদেশের অংশে করা, একই সঙ্গে গুদামের খরচ কমাতে ভারতের অংশে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ি প্রবেশের অনুমতি (কার পাস) দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতানুগতিক পদ্ধতিতে পণ্য গাড়িতে লোড-আনলোড করায় সময় লাগছে বেশি। এতে পণ্যের মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ভারতে প্রায় সব বন্দরে শ্রমিক ও গাড়িচালকদের সিন্ডিকেটের কারণেও নানা ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

এ বিষয়ে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন জানান, ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানিতে বেশকিছু শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রয়েছে। এর আগে আমরা বেশ কয়েকবার সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করেছি।

ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আবারও আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, অবকাঠামোগত সমস্যাই প্রধান সমস্যা। এর সমাধান না হলে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ত্বরান্বিত সম্ভব নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে আগে কাজ করা উচিত।

এদিকে, ভারতের বাজারে পণ্য রফতানি করে দেশের এমন শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, বন্দরে কাস্টমসের সময়ক্ষেপণ অন্যতম সমস্যা। বন্দরে কাস্টমসের কাজ চলে সকাল ১০টায় থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। অর্থাৎ আমদানি ও রফতানির জন্য প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় পাওয়া যায়।

‘এ সময়ের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০টি পণ্যবাহী গাড়ি সীমানা পারাপার করতে পারে। যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। তাই আমদানি ও রফতানি নির্বিঘ্ন করতে বন্দরের কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা প্রয়োজন। অথবা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা চালু করা দরকার।’

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (শুল্ক) লুৎফর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা চাই রোববার লেনদেন হোক। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেটা চায় না। আবার আমাদের শুক্রবার বন্ধ কিন্তু ওদের খোলা। বন্ধের দিন খোলা রাখার বিষয়টি দুই দেশের সিদ্ধান্তের বিষয়। আমরা একা চাইলে হবে না।’

বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি চার হাজার ৭৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ ছিল ৬৮৯ দশমিক ৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার বিপরীতে ৫৪৫০.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়।

এসআই/এমএমএ/এমএআর/জেআইএম