সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাকমা সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ছড়া থেকে উত্তোলিত পাথর ও ভারত থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে বিনা শুল্কে নিয়ে আসা চুনাপাথর থেকে বিজিবি-পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয় চাঁদার ভাটোয়ারা হজম করছেন স্থানীয় এক সাংবাদিক পরিচয়ধারীও।
অভিযোগ উঠেছে উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের দুধেরআউটা গ্রামের নুর জামালের ছেলে বিজিবি-পুলিশের কথিত সোর্স পরিচয়ধারী জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন এই চাঁদাবাজি বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় নতুনবাজার, শ্রীপুর বাজারসহ সীমান্তের অধিকাংশ বাজারে এজেন্ট বসিয়ে ভারতীয় তীর খেলা (শিলং খেলা) থেকে বিজিবি-পুলিশের নাম ভাঙিয়ে জিয়া ও তার সহযোগী প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। যেন দেখার কেউ নেই!
তবে বিষয়টি জানতে গত তিন দিন ধরে ও শুক্রবার সকালে সোর্স পরিচয়ধারী জিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় বালিয়াঘাট ও টেকেরঘাট বিজিবি ক্যাম্পের নামে বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে গেল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শীর্ষ পর্যায়ের একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের হাতে আটক হয়ে জেলের ঘানি টেনেছেন সোর্সপরিচয়ধারী জিয়া (তাহিরপুর থানার চাঁদাবাজি মামলা নং-জিআর-১৬৩/০৭ইং)।
মাস ছয়েক পর আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা জিয়া সেই থেকে হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। অতঃপর তার সহযোগী হয়ে ওঠে স্থানীয় এক সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি। এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে, দুইজনের আঙ্গুলের ইশারায় সীমান্তে চোরাচালান ও চাঁদাবাজি হয়ে আসলেও উল্টো ফেঁসে যাওয়া আর মামলা-হামলার ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ সেখানকার বাসিন্দারা।
অপরদিকে জনৈক ওই সাংবাদিক পরিচয়ধারীও গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বালিয়াঘাট বিজিবির নাম ভাঙিয়ে জোয়াড়িদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত মোটা অংকের চাঁদা নেয়ার অভিযোগে বিজিবির হাতে আটক হন। পরবর্তীতে একাধিক সাংবাদিকের অনুরোধে মুছলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেন তৎকালীন সুনামগঞ্জ বিজিবি ব্যাটালিয়ন-২৮ এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তাজুল ইসলাম ঠাকুর। এছাড়া তৎকালিন সময়ে বিজিবির দায়েরকৃত একটি চোরাচালানী মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিও ছিলেন ওই সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি।
জানা যায়, শুধু পাথরই নয় টেকেরঘাট সীমান্তের অপর দু’টি পয়েন্ট দিয়ে বিনা শুল্কে চোরাচালানের মাধ্যমে নিয়ে আসা হ্যান্ডট্রলি বোঝাই চুনাপাথর থেকেও লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে আসছেন সোর্স জিয়া।
এদিকে চাঁদাবাজি ও চোরাচালান বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারণা চললে কালেভদ্রে সরেজমিন তদন্ত করতে বিজিবি ও পুলিশের দায়িত্বশীলরা কিছুটা তৎপরতা হয়ে উঠেন। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, চোরাচালানিদের দাপট এবং অতি সখ্যতায় স্থানীয় বিজিবি-পুলিশের কিছু অসৎ সদস্যের পরোক্ষ সহযোগিতার কারণে থমকে যায় তদন্ত কাজ, বেঁচে যান অভিযুক্ত জিয়া ও তার সহযোগী।
জানা যায়, টেকেরঘাট সীমান্তের পাহাড়ি ছড়া ও লাকমা ছড়া থেকে স্থানীয় কয়েক শতাধিক দিন-মজুর নারী-পুরুষ পাথর উক্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এই দুই ছড়া থেকে দুই সহস্রাধিক হ্যান্ডট্রলি বোঝাই পাথর দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌ-পরিবহনের মাধ্যমে সরবরাহের জন্য সুনামগঞ্জ-৮ বর্ডারগার্ড (বিজিবি) ব্যাটালিয়নের অধিনস্থ বালিয়াঘাট বিওপি ক্যাম্পের অদুরে পাটলাই নদীর তীরে ডাম্পিং করা হয়।
গত দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে স্থানীয় শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা এভাবেই সীমান্তের পাথর উত্তোলন ও ব্যবসা করে আসছেন।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক জানান, সীমান্তছড়া থেকে পাথর উত্তোলন ও ব্যবসা করার জন্য প্রতি হ্যান্ডট্রলি বোঝাই পাথরের জন্য এ বছর ১৮৫ টাকা করে চাঁদা দিতে হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় প্রতি ট্রলিতে বেড়েছে ৩০ টাকা। এবার নাকি সাংবাদিক বেশি, তাই চাঁদার পরিমাণও বেড়েছে। অথচ ফসলহানির এ বছরে চাঁদার পরিমাণ কম হওয়ার কথা। এসব থেকে সোর্স জিয়া চাঁদা হিসেবে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছেন অর্ধলক্ষাধিক টাকা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদা না দিলে বিজিবি-পুলিশ ও স্থানীয় সাংবাদিক দিয়ে প্রায়ই পাথর উত্তোলন ও ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া হয়। হুমকি দেয়া হয় চোরাচালানি বানিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার। এই ভয়ে মুখ খুলতে চায় না কেউ, নিরাপদ থেকে চাঁদা দিয়েই ব্যবসা করা ভালো। সকল ব্যবসায়ীদের চাঁদা পরিশোধ না হওয়ায় বিজিবির সিও (কমান্ডিং অফিসার) আসবেন বলে গত বৃহস্পতিবার (২৪ মে) পাথর উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ ছিল।
আক্ষেপ করে ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, যারা পাথর ব্যবসা করেন তাদের ব্যবহৃত মোবাইল প্রায়ই চেক করেন সোর্স জিয়া ও জনৈক ওই সাংবাদিক। কারণ হিসেবে জানতে চাইলে বলেন, যাতে কোনো সাংবাদিক কিংবা প্রশাসনিক কোনো কর্মকর্তার নম্বর না থাকে। যদি ফোন করে এ তথ্য ফাঁস করে দেয় কেউ!
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বরকতুল্লাহ খান বলেন, সীমান্তে পুলিশের নামে চোরাচালান ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত জিয়া ও তার সহযোগীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে আমার পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে।
বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়ন- ৮ এর কমান্ডিং অফিসার লে.কর্নেল মো. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, বিজিবি সদস্যদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায়কারী জিয়া ও তার সহযোগীদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাজু আহমেদ রমজান/এফএ/এমএস