দেশজুড়ে

২ জমিদার বাড়ি সংরক্ষণের দাবি এলাকাবাসীর

পটুয়াখালী সদর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে ৮০০ বছরেরও বেশি পুরনো জমিদার আলে খাঁ আর কালে খাঁর জমিদার বাড়ি। জমিদার আলে খাঁর ও কালে খাঁর বাড়িকে স্থানীয়ভাবে মিয়া বাড়ি বলা হয়। তবে জমিদারদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে এখন অনেকটাই অজানা। জমিদার বাড়ি দুটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

জানা গেছে, শ্রীরামপুরে মোঘল শাসকদের বেশ কিছু স্থাপনা ছিল। মোগল শাসন শেষ হবার পর সেসব স্থাপনা পরিত্যাক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই সকল স্থাপনা সংস্কার করে বাংলার নবাব মুরশিদ কুলিখানের প্রধান খাজানজীর সিবন মজুমদার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সীবন খাঁ নাম ধারণ করে পরে তিনি পটুয়াখালীর শ্রীরামপুরে তার জমিদারি গড়ে তোলেন।

৯০০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত প্রাচীন চন্দ্রদীপ অর্থাৎ বৃহত্তর পটুয়াখালীতে বৌদ্ধ ধর্ম ও সভ্যতার বিকাশ ঘটে। সেই হিসাব মতে ধারণা করা হয় এই স্থাপনাগুলো ৮০০ বছরেরও বেশি পুরনো। জমিদার আলে খাঁ ও কালে খাঁর ৫২ কানি সম্পত্তি। জমিদার বাড়িটি বিশাল যার অনেক কিছুই ধ্বংস হয়ে গেলেও যেটুকু রয়েছে সেটুকুও কম নয়।

এখানে এখনও সিবন খাঁর বংশধরেরা বসবাস করেন। তারই দুই ছেলে আলে খাঁ আর কালে খাঁ। তারা দুজনই ছিলেন অত্যাচারি রাজা, তাদের নামেই এই জমিদার বাড়ি ২টি। তবে বাড়ি ২টির সঠিক ইতিহাস কেউ জানে না।

শহরের নতুন বাজার ট্রলার ঘাট দিয়ে লাউকাঠি নদী পার হয়ে লাউকাঠি বাজার। লাউকাঠি বাজার থেকে শ্রীরামপুর যেতে ১০ কি.মি. এর সড়ক পথ। ১০ কি.মি. সড়ক পথ অতিক্রম করার পরে কসরত খার ওয়ারিস ১২ পরিবার যেই জমিদার বাড়িটি বর্তমানে মাঝের জমিদার বাড়ি নামে এলাকায় পরিচিত সেখানে বসবাস করেন।

এই বাড়িটির প্রবেশ পথে ছিল মোট ৮টি গেট। তবে বর্তমানে গেট না থাকলেও রয়েছে এর চিহ্ন। এরকিছু দূরত্বে আছে একটি পুকুর। এরকিছু পরেই বিতর্কিত অন্ধর কূপ, অন্ধর কূপটি বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। খাজনা দিতে না পারলে বা প্রজারা জমিদারের কথা না শুনলে প্রজাদের উপর চালানো হত অত্যাচার। যার নৃসংশতা আন্দাজ করা যায় না।

বাড়িটির পিছনে আছে তিনটি বন্দিসালা। বন্দিসালায় রাখা হত ওই সকল প্রজাদের। অনেকের মতে ওই অন্ধর কুপের মধ্যে মানুষকে ফেলে দিয়ে রাজারা পরম আনন্দ উপভোগ করতো। বাচ্চা থেকে বুড়ো পর্যন্ত সমস্ত বয়সের মানুষকে এই অন্ধর কুপের মধ্যে ফেলে দেয়া হত।

সিবন খাঁর অপর জমিদার বাড়ির প্রবেশ পথের সামনে রয়েছে একটি মঠের মত জোড়া কবরস্থান। কবরস্থানে শায়িত আছেন কালে খাঁ ও তার স্ত্রী। কবর থেকে ১ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ পেরলেই চোখে পড়বে ৮০০ বছরের পুরাতন কালে খাঁ জামে মসজিদ। সিবন খাঁর জমিদারি স্থাপনার মধ্যে এই মসজিদটি অন্যতম।

১৯৯৬ সালে মসজিদ এবং জোড়া কবরটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর কর্তৃক সংস্কার করা হয়েছিল। এরপরে একজন প্রহরিও নিযুক্ত করা হয়। তবে এই বিশাল ঐতিহ্যের কোনো ইতিহাস বা এ সম্পর্কে কোনো তথ্য সম্বলিত সাইন বোর্ড চোখে পড়েনি।

এই মসজিদের পিছনেই আছে আরেক জমিদার বাড়ি। কালেখাঁর জমিদারিতে ৫৭টি মৌজা ছিলো আর তা থেকে উঠতো অনেক টাকা। কথিত আছে এই বাড়িতে ৫৭টি মৌজা থেকে আয় করা টাকা ৭ দিন ৭ রাত ঘোড়ার পিঠে করে এনে ওই বাড়ির কোনো এক কোণে রাখা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়। পরে সেটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ ওই টাকার খোঁজ পায়নি।

আলে খাঁ আর কালে খাঁর জমিদার বাড়ির বাইরেও আছে একটি পুল। পুলটি তৈরি করেছিল কালে খাঁর ছেলে রুম্মা ১৮১০ সালে যা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর কর্তৃক সংস্কার করা হয়েছিল কিন্তু এটি সম্পর্কেও কোথাও কোনো কিছু লেখা নেই। এলাকায় এটি কালে খাঁর ব্রিজ নামে পরিচিত।

জমিদারের ওয়ারিশ কামরুজ্জামান টিপু জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৯৬ সালে জোড়া কবরস্থান ও মসজিদ এবং ব্রিজ বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর খুলনা বিভাগ কর্তৃক সংস্কার করা হয়েছিল। সংস্কারের পরে এখানে একজন প্রহরীও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এখানে কোনো প্রহরী নেই। এখন জমিদারের এসকল ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দোগ না নিলে নতুন প্রজন্মের কাছে তা অজানাই থেকে যাবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে জমিদার বাড়ি ২টি সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।

মহিব্বুল্লাহ্ চৌধুরী/এফএ/এমএস