রাজবাড়ীর তিন উপজেলার (রাজবাড়ী সদর, পাংশা ও গোয়ালন্দ) বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে পদ্মার আগাম ভাঙন। এ ভাঙনে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ রাজবাড়ী শহর রক্ষা বাঁধটি রয়েছে হুমকির মুখে।
ভাঙন আতঙ্কে থাকা ওইসব এলাকাবাসীর দাবি দ্রুত নদী শাসনে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে গুরুত্বপূর্ণ ঐসব স্থাপনাসহ এ বর্ষা মৌসুমে রাজবাড়ী শহর রক্ষাকারী বাঁধটিও নদীতে বিলিন হয়ে যাবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো রাজবাড়ীবাসী।
এদিকে জনপ্রতিনিধিদের সাঙ্গে নিয়ে ভাঙন ও ভাঙন হুমকিতে থাকা এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিভিন্ন সময় পরিদর্শন করছেন স্থানীয় জেলার সাংসদ, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ সুশীল সমাজের লোকজন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই পদ্মার কোল ঘেষে জেলার বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। আর ভাঙন হুমকিতে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন স্কুল, মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান, হাট-বাজার, বসতবাড়ী, ফসলি জমি ও রাজবাড়ী শহর রক্ষাকারী বাঁধ।
ইতোমধ্যে পদ্মার ভাঙনে ৩ উপজেলার প্রায় ৪০/৫০টি বাড়ি নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে ভিটেমাটি ছেড়েছে বহু পরিবার। গত ১ মাসের ব্যবধানে এসব পরিবার অন্য স্থানে সরিয়ে নিয়েছে তাদের বসতভিটা।
ভাঙন হুমকিতে থাকা ১৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪টি বিদ্যালয় যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এগুলো হচ্ছে জেলা সদরের পূর্ব উড়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম উড়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মহাদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাংশার হাবাসপুর সরকারি প্রাথমকি বিদ্যালয়।
ভাঙন কবলিত গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার কাশেমনগর, নয়নসুখ, পূর্ব উড়াকান্দা, উড়াকান্দা, ভবদিয়া, সোনাকান্দর, মহাদেবপুর, বড়চরবেনীনগর, চরধুঞ্চি, চরজৌকুরি, জৌকুরা, পাংশা উপজেলার চররামনগর, চরশাহমিরপুর, শাহমিরপুর, নতুনচরপাড়া, পূর্বচর আফড়া, পূর্ব হাবাসপুর, গোয়ালন্দ উপজেলার বাহির চর দৌলতদিয়া।
এছারা জেলা সদরের উড়াকান্দা এলাকায় রাজবাড়ী শহর রক্ষাকারী বাঁধটি রয়েছে হুমকির মুখে।
তবে ভাঙন আতঙ্কে থাকা বা ভাঙন কবলিত এলাকায় ভাঙন রোধে স্বল্প মেয়াদি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে কিছু কিছু স্থানে। এর মধ্যে বাঁশ দিয়ে পাইলিং ও বালুর বস্তা ফেলে ডাম্পিং করে চলছে ভাঙন রোধের চেষ্টা। কিন্তু এতে সন্তুষ্ট নয় ভুক্তভোগি পরিবার ও ভাঙন আতঙ্কে থাকা পরিবারগুলো। তারা চান ভাঙন রোধে একটা স্থায়ী সমাধান।
বাহির চর দৌলতদিয়ার আসমা বেগম, জালাল কাজী, ফুল খা, দারোগ আলী, সিদ্দিকসহ অনেকে বলেন, বর্ষা শুরুর আগেই ভাঙন শুরু হওয়ায় বিপদে পড়েছি। এরইমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে আমাদের এলাকার ১৫/২০টি পরিবারের বসত ও রান্নাঘরসহ ৫০ থেকে ৬০টি ঘর। বসতবাড়ির যা যা ছিল সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছি। এভাবে আর কত দিন চলব, আমরা স্থায়ীভাবে নদী শাসন চাই। এভাবে যেন আর বাপ-দাদার বসতবাড়ি হারাতে না হয় আমাদের।
নয়নসুখ এলাকার সুলতান শেখ, সোহাগী বেগম, জাবেদ শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পদ্মায় এবার আগাম ভাঙন শুরু হয়েছে তাই বাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছি। এ ভাঙনে যেটুকু মাথা গোঁজার জায়গা ছিল তা এখন নদীতে বিলিনের পথে। এখন আমরা কোথায় যাব, কী করব।
পূর্ব উড়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আসজাদ হোসেন বলেন, গতবছর কিছু বালুর বস্তা ফেলে ডাম্পিং করে স্কুলটি রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এ বছর নদী এখন বিদ্যালয় ভবনের মাত্র দুই ফুট দূরে। জরুরিভাবে পদক্ষেপ না নিলে এ বিদ্যালয়টি পদ্মায় হারিয়ে যাবে।
পাউবো নির্বাহী পরিচালক গৌরপদ সূত্রধর বলেন, নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য একটি বড় প্রকল্প পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধানের জন্য বরাদ্ধ পাওয়া যায়নি। এতে করে বেড়িবাঁধ বা নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য স্থায়ী সমাধানের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসক শওকত আলী বলেন, যোগদানের পরের দিনই আমি নদী ভাঙন এলাকায় গিয়েছি। সমাধানের পথ দুটো। একটা স্বল্পমেয়াদি আরেকটি দীর্ঘ মেয়াদি। আপাতত বাঁশের পাইলিং ও বালুর বস্তা ফেলে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এছাড়া নদী শাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ফকীর আবদুল জব্বার বলেন, নদী শাসন ও ভাঙন রোধের ব্যাপারে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে কিন্তুু কোনো বরাদ্দ এখনও পাওয়া যায় নায়। এখন জনগণ স্বতস্ফুর্তভাবে যার যার বাড়ির সামনে সেই সেই বাঁশ কাঠ ও টিন দিয়ে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কাজী কেরামত আলী জানান, রাজবাড়ীতে নদী ভাঙতে ভাঙতে রাজবাড়ীর মানচিত্র ছোট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ডিপিপি পাস না হওয়ায় স্থায়ী ব্যাবস্থা করা যাচ্ছে না। আপাতত দুইশ মিটার এলাকায় ১২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে তবে এই বস্তায় নদী ভাঙন রোধ হবে বলে মনে হয় না।
জেলা সদরের লালগোলা থেকে উড়াকান্দা বাজার পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকা যার পুরোটাই নদী ভাঙনের মুখে, গত বছর বন্যার সময় এই এলাকার কয়েক হাজার ঘর বাড়ি, ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে। ভাঙন কবলিত এলাকার জন্য মন্ত্রণালয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজবাড়ী থেকে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ভাঙন রোধে দীর্ঘ মেয়াদী ব্যবস্থা নেয়া যাবে।
রুবেলুর রহমান/এফএ/এমএস