জাতীয়

তুফানে আল্লাহকে ডাকা ছাড়া কিছুই করার নেই চরবাসীর

‘আন্ডা (আমার) চরের মানুষ। খেত খামারে কাজ করি খাই। আঙ্গোরে (আমাদেরকে) নিয়ে কে ভাবে? যেই বছর খেতে ধান অয় (হয়) হেই (সেই) বছর ভালা চলে। আর ধান না অইলে উপবাস থাকি।বন্যা-টন্য অইলে (হলে) বই বই (বসে বসে) আল্লারে বোলান (ডাকা) ছাড়া আঙ্গো আর কিচ্ছু করার নাই।’

দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলেছেন নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার দমার চরের বাসিন্দা আবুল কাশেম। সত্তরোর্ধ্ব এই বৃদ্ধার জীবনের প্রায় ৩০টি বছর কেটেছে এই চরে। চরটিতে শতশত মানুষ বসবাস করলেও এখনও কোনো রাস্তাঘাট তৈরি হয়নি। বুঝিয়ে দেয়া হয়নি স্থানীয় ভূমিহীনদের জমিও।

বঙ্গোপসাগরে একেবারেই মুখে অবস্থিত এই চরটির অবস্থান দ্বীপের একেবারেই দক্ষিণ প্রান্তে। সাগর থেকে কোনো দুর্যোগ আসলেই প্রথম আঘাত হানবে এই চরে। বিশাল আয়তনের চরটিতে নেই কোনো বেড়িবাঁধ। নেই চলাচলের জন্য রাস্তাঘাটও। দ্বীপের মূল ভূ-খণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এ চরটিতে নেই কোনো আশ্রয় কেন্দ্রও।

আবুল কাশেম নয়, তার মতো শতশত মানুষ বসবাস করছে দ্বীপের অন্য চরাঞ্চলগুলোতে। যেসব চরে নেই কোনো উন্নয়ন জীবন ব্যবস্থা। সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়াও লাগেনি।

জানা গেছে, প্রায় ছোট বড় ২০টি চর নিয়ে হাতিয়া দ্বীপ গঠিত। এসব চরের মধ্যে অন্তত ১৫টি চরে মানুষ বসবাস করছে। এর মধ্যে ৫টি চর মোটামুটি উন্নত। বাকি ১০টি চরে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। যে কারণে কোনো দুর্যোগ মুহূর্তে এসব চরের মানুষ কোনো বার্তা পায় না। বিভিন্ন সময়ে উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে এই চরগুলোতে প্রাণহাণির ঘটনা ঘটেছে।

হাতিয়া দ্বীপের চরগুলোর মধ্যে বয়ারচর, নলেরচর, ক্যারিংচর, হাজাজ্জারচর (স্বর্ণদ্বীপ), জাগলারচর, ঢালচর, দমারচর, মৌলভীরচর, কেলাতলিরচর, চরঘাসিয়া, চরগজারিয়া অন্যতম। এর মধ্যে বয়ারচর, নলেরচর, ক্যারিংচর, হাজাজ্জার চরের (স্বর্ণদ্বীপ) মানুষ মোবাইল ফোন ও টেলিভিশনের মধ্যেমে দুর্যোগ বার্তা জানতে পারলেও বাকিচরগুলোতে কোনো খবর পায় না। ওই চরগুলোতে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোও কোনো নেটওয়ার্কের আওতায় আসেনি। নেই কোনো রাস্তাঘাট কিংবা আশ্রয় কেন্দ্র। এই চরগুলোতে অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছে। এসব চরে অন্তত দুই লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছে।

বন্যা কিংবা দুর্যোগের জন্য তাদেরকে আকাশের দিকেই চেয়ে থাকতে হয়। আকাশে একটু মেঘ দেখলেই চরবাসীর মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক বিরাজ করে। কেনো না এসব চরে নেই কোনো বেড়িবাঁধ। সাগরে সামান্য জোয়ার বাড়ালেই পুরো চর তলিয়ে যায়। অনেক সময় কোলের শিশু স্রোতের সঙ্গে ভেসে যায়। নষ্ট হয় লাখ লাখ একর জমির ফসল।

জানতে চাইলে ঢালচরের বাসিন্দা মোশরেকা বেগম বলেন, আকাশে একটু মেঘ দেখলেই আতঙ্কে থাকি। ওপরের খবরাখবর তো আমরা পাই না। আকাশের দিকেই তাকিয়েই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। এছাড়া কোনো উপায় নেই। মুহূর্তে মহূর্তে ঝড়বাদল সৃষ্টি হয়। ঘরবাড়ি এমনকি বসত ভিটার ওপরেও পানি উঠে যায়। চরের ছেলে-মেয়েরা পানিতে ভেসে যায়। শতশত গরু-মহিষ বিভিন্ন সময় বন্যার সঙ্গে ভেসে গেছে। কেউ তো একটু জিজ্ঞাসাও করে না। মনে হচ্ছে উপজেলা প্রশাসন এমপি, চেয়ারম্যানরা আমাদেরকে তাদের ভোটারও মনে করেন না।

এমএসএস/জেএইচ/বিএ