দেশজুড়ে

‘স্বপ্নজয়ী মা’ নুরজাহান বেগমের স্বপ্ন জয়ের গল্প

নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে স্বপ্ন পূরণের যুদ্ধে সন্তানকে জয়ী করেন অদম্য মা। প্রতিটি সন্তানের জয়ের গল্পের নেপথ্যে যার সবচেয়ে বড় অবদান তিনি হচ্ছেন মমতাময়ী মা। তেমনি এক ‘স্বপ্নজয়ী মা’ হয়ে উঠার গৌরব অর্জন করেছেন ঠাকুরগাঁও শহরের রোড এলাকার নুরজাহান বেগম। এই ‘স্বপ্নজয়ী মা’ নুরজাহান বেগমের সফলতার পেছনের গল্পটি তুলে ধরেছেন আমাদের এ প্রতিবেদক।

নূরজাহান বেগম ছোট বেলায় বেড়ে উঠেছেন গাইবান্ধা জেলায়। স্কুল জীবন শেষ করার আগেই মা-বাবা ছোট বেলায় ১৯৭৪ সালের দিকে ঠাকুরগাঁও রোড এলাকার মৃত নবীর উদ্দিনের ছেলে শামসুল হকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করান নুরজাহানকে। স্বামী শামসুল হক পেশায় ছিলেন রেলওয়ে বিভাগের স্টেশন মাস্টার।

ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বিয়ের পর নুরজাহান বেগমের পড়াশুনা করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু নুরজাহান নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করার আগে প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হয়েছিলেন। বিয়ের কিছুদিন পরেই জন্ম নেয় প্রথম ছেলে সন্তান। স্বামী সরকারি চাকরি করলেও তখন বেতন কাঠামো কম হওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো নূরজাহান ও তার পরিবারকে।

ছেলে বেড়ে ওঠার পর স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। যেহেতু নুরজাহান ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক ও সামাজিক কারণে পড়াশুনা করতে পারেনি। কিন্তু পড়া লেখার স্বপ্নটা আবার শুরু করেন ছেলেকে নিয়েই। ছেলের পড়াশুনার মনোযোগী হওয়ায় আরও আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে ছেলে নুর মোহাম্মদকে ভর্তি করেন ঠাকুরগাঁওয়ের সুনামধন্য বিদ্যাপীঠ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে।

ছেলের মাধ্যমিকে ভালো ফলাফলের কারণে নুরজাহান বেগমের ইচ্ছে জাগে তাকে ডাক্তার বানানোর। কিন্তু সংসারের তেমন স্বচ্ছলতা না থাকার কারণে ছেলেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করাতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি হয় তার । তবুও থেমে থাকেননি তিনি। নুরজাহান বেগম ছেলেকে ঢাকায় ভর্তির জন্য পাঠিয়ে দেন। তবে ছেলে নুর মোহাম্মদ বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েটে) ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। এর মাঝেই নুজাহানের ঘরে আর এক ছেলের জন্ম হয়।

এরপর থেকেই বড় ছেলেকে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বাবা শামসুল হকের টাকা দিতে অনেকটা বেগ পেতে হয়। নুর মোহাম্মদ সংসারের দিক ও মায়ের ইচ্ছে পূরণের জন্য টিউশনি দিয়ে নিজের খরচের ব্যবস্থা করে নেন। এরপর নুরজাহান বেগম মোঝো ছেলেকেও নিয়ে পড়াশুনায় মনোযোগী হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তার কয়েক বছর পর আবারো এক ছেলে ও মেয়ের জন্ম হয়। মেঝো ছেলে নুর নবী সফলতার সঙ্গে মাধ্যমিক শেষ করে। ঢাকায় ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য চলে যান। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ হয় তার।

এরপর নুরজাহান বেগম ছোট ছেলে ও মেয়েকে বড় ছেলেদের মত পড়াশুনায় মনোযোগী করেন। বড় ভাইয়েদের লেখাপড়া দিক বিবেচনা করে ছোট ভাই ও বোন কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিকের ফলাফল অর্জন করে। যেহেতু বড় ছেলেকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তাই ছোট মেয়েকে ডাক্তারি পড়ানোর জন্য উৎসাহ প্রদান করতে থাকেন। নুরজাহান বেগম ছেলে-মেয়েকে মানুষের মত মানুষ করার জন্য অভাবের সংসারেও স্বামীকে কিছুদিনের জন্য ছেড়ে ২০০১ সালে তিন বছরের জন্য ঢাকায় পাড়ি জমান।

ঢাকার একটি ছোট রুমে তখন শুরু হয় মা, মেয়ে ও দুই ছেলের স্বপ্ন জয়ের সংসার। ছোট রুমেই ছেলে মেয়ের পড়াশুনা, খাওয়া-দাওয়া। সবকিছুতেই কষ্ট হয় নুরজাহানের। অপর দিকে ঠাকুরগাঁওয়ে শামসুল হক নিজের কষ্ট সহ্য করেও পরিবারের সদস্যদের ইচ্ছে পূরণে অনেক কিছুই ত্যাগ শিকার করেন।

নুরজাহানের ইচ্ছে মেয়েকে যেভাবেই হোক মেডিকেলে ভর্তি করতেই হবে। বড় ছেলের উৎসাহে অবশেষে ছোট বোন নূর ই আফজা সালমা সফলতার সঙ্গে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। এর মধ্যেই ছোট ছেলে নুরুল আমিন ঢাকা কলেজে মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে সফলতার সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

নূরজাহানের বড় ছেলে শাহ সুফি নুর মোহাম্মদ বুয়েট থেকে যন্ত্রকৌশল বিভাগ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে ২৫ তম বিসিএস এর মাধ্যমে রেলওয়ে প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। মেজো ছেলে শাহ্ সুফি নুর নবী সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার উপ-পরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন।

ছোট ছেলে নুরুল আমিন ঢাকা কলেজ থেকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে রেলওয়ের ‘অডিটর’ পদে কর্মরত রয়েছেন।

নুর জাহানের ছোট মেয়ে নূর ই আফজা সালমা বেগম সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে যুক্তরাজ্যে এমআরসিপি সম্পন্ন করে সেখানই একটি হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন।

চার সন্তানের সফলতার কথা জানতে চাইলে নুরজাহান বেগম বলেন, আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রুপ নিয়েছে। চার সন্তানের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছেনে শুধু আমার অবদান সেটি নয়, সন্তানদের বাবা যদি আমাকে উৎসাহ ও সহযোগিতা না করত আজ হয়তো তাদেরকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারতাম না। এছাড়া আমার সন্তানরা শিক্ষা ক্ষেত্রে খুবই মনোযোগী ছিল তাই আজ তারা সফল। একজন মা যদি ছোট থেকেই সন্তানকে যত্নশীল হয়ে গড়ে তুলে তাহলে সফলতা আসবেই।

মেজো ছেলে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার উপ-পরিচালক শাহ্ সুফি নুর নবী সরকার জানান, আমরা তিন ভাই ও এক বোন আজ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। এই অবদানের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মায়ের। এরপর বাবা ও বড় ভাইয়ের। এই তিনজনের সহযোগিতা না পেলে আজ আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারতাম না।

নুরজাহান বেগমের স্বামী শামসুল হক জানান, আমার স্ত্রী ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। অনেক সময় খুব হিমশিম খেতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু আজ আমি আমার সন্তানদের নিয়ে খুবই গর্ববোধ করি। চার সন্তানের সফলতার জন্য আমার স্ত্রীর অবদানই সবচেয়ে বেশি।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে ৯ জন স্বপ্নজয়ী মাকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের ‘স্বপ্নজয়ী মা’ নুরজাহান বেগম অন্যতম।

আরএআর/পিআর