দেশজুড়ে

নরসিংদীতে মানবপাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য : ভুক্তভোগীদের হাহাকার

নরসিংদীতে দৌরাত্ম্য বেড়েছে মানবপাচারকারী চক্রের। দালালদের প্রলোভনে গা ভাসিয়ে কেউ কেউ হচ্ছেন জিম্মি। আবার কেউ ফিরছেন লাশ হয়ে। তবু থেমে নেই অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন। আর মানবপাচারকারীদের দাবিকৃত মুক্তিপণ দিতে না পারলেই নেমে আসে ভয়ানক নির্যাতন। আবার মুক্তিপণ দিয়েও স্বজনদের ফিরে পাচ্ছে না অনেক পরিবার। তাই নরসিংদীর বেশ কয়েকটি পরিবারজুড়ে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের অশ্রু আর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গোটা এলাকা। অন্যদিকে পোয়া-বারো দালাল চক্রের সদস্যদের। জনপ্রতি পাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু  যাদের তত্ত্বাবধানে এসব তথ্য থাকার কথা সেই কর্মসংস্থান ও জনশক্তি বিভাগ উত্তর দিলেন দায়সারা। অবৈধভাবে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছে এমন লোকজন ও তাদের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ২ বছর যাবৎ নরসিংদী, শিবপুর, রায়পুরা ,মাধবদীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। প্রথমে দালাল চক্রের সদস্যরা গ্রাম-গঞ্জের উঠতি বয়সী যুবক, কল-কারখানার শ্রমিক ও দরিদ্র লোকজনদের টার্গেট করেন। পরে তাদের বিনা টাকায় মালয়েশিয়া যাওয়াসহ ভালো চাকুরির প্রলোভন দেয়। আর এ ফাঁদে পরে দারিদ্রের কষাঘাতে পিষ্ট নরসিংদী জেলার শত শত লোক অবৈধভাবে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন। উত্তাল সাগরে এদের বাহন ট্রলার কিংবা কার্গো। খেয়ে না খেয়ে অনেকেরই ঠাঁই হয় পাচারকারীদের বন্দীশালায়। এরপর শুধুই নির্যাতনের গল্প। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় নরসিংদী শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের মুনসেফের চর এলাকার হান্নান মিয়া ও মোজ্জাম্মেল খান সাগর পথে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায়। কিন্তু পৌঁছতে পারেনি মালয়েশিয়ায়। দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে ঠাঁই হয় থাইল্যান্ডের জঙ্গল। তারপর মুক্তিপণের জন্য নিরীহ এসব মানুষদের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। আর দালালদের চাহিদা মতো মুক্তিপণ দিতে না পাড়লেই গাছে ঝুলিয়ে পেটানোসহ নির্মম অত্যাচার চালানো হয়। এমন কি অনাহারে রাখা হয় দিনের পর দিন।  ৭দিন পর পর খাবার হিসেবে কয়েক মুঠো চাউল দেয়া হলেও পানি দেয়া হয় না। খাবার পানি চাওয়ার অপরাধে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে নরসিংদী শিবপুর উপজেলার মুনসেফের চর এলাকার হান্নান মিয়াকে। এই দৃশ্য নিজ চোখে দেখে ভয়ে আতকে উঠে একই এলাকার মোজাম্মেল খান। নিজের জীবন বাঁচাতে দালালদের কথামতো পরিবারের কাছে ২লক্ষ বিশ হাজার টাকা পাঠানোর জন্য বাবাকে অনুরোধ জানান। ছেলেকে বাঁচাতে দালালদের কথামতো স্থানীয় দালাল মনিরের হাতে মুক্তিপণের টাকাও তুলে দেয়া হয়। কিন্তু এখনো ছেলেকে ফিরে পায়নি মোজ্জামেলের পরিবার। টাকা নিয়ে লাপাত্তা মনির। মোয়াজ্জেম খানের বাবা মোস্তফা খান বলেন, স্থানীয় দুই দালাল হানিফা ও আমির হোসেনের সহযোগিতায় নরসিংদীর বৌয়াকুড়ের দালাল মনিরের কাছে দিয়েছেন ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু থাইল্যান্ডের দালালদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা টাকা পায়নি বলে জানিয়ে দেয়। পুনরায় তাদের টাকা না দিলে ছেলেকে মেরে জঙ্গলে পুতে দেবে বলে জানিয়ে দেয়। কিন্তু ছেলেকে বাঁচাতে দ্বিতীয় দফায় এত টাকা কোথায় পাবো ? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল জানায়, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানবপাচারের সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেট কক্সবাজার। সেখানকার দালালরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দালালদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন। তাদের ভাষায় একজন মক্কেলকে কক্সবাজার পযর্ন্ত পৌঁছে দিতে পারলেই জনপ্রতি স্থানীয় দালালদের বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা দেয়া হয়। আর এই লোভে দালালরা গ্রামগঞ্জে নিরীহ মানুষ, কলকারখানার শ্রমিকদের টার্গেট করে তাদের ফাঁদে ফেলে কক্সবাজার পর্যন্ত নিয়ে যায়। কক্সবাজার পর্যন্ত নেওয়ার পরই তাদের দায়িত্ব শেষ বলে জানান তিনি।এদিকে শনিবার সাগর পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার পূর্ব মুনসেফের চর গ্রামের আবদুল হান্নানের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছে স্বজনদের কাছে। সেই সংবাদ বাড়িতে পৌঁছার পরই স্বজনদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার জুড়ে চলছে শোকের মাতম। নিহত হান্নানের অবুজ দুই সন্তান এখনো জানে না তাদের বাবা চলে গেছে ফেরার দেশে। তাই হান্নান মিয়ার স্ত্রী খাদিজা বেগম আর্তনাদ করে বলেন, যাকে ঘিরে আমার এই পৃথিবী সৃষ্টি সেইতো নাই, আমার সন্তানদের জীবন কিভাবে কাঁটবে?  এদিকে হান্নানের মৃত্যুর সংবাদে রোববার রাতে স্থানীয় দুই দালাল হানিফা ও আমির হোসেনকে আটক করে নিহতের বিক্ষুব্ধ স্বজনরা। কিন্তু পুলিশ ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে তারা ছাড়া পায়। কিছুদিন আগে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে দালালদের বন্দীদশা থেকে পালিয়ে সে দেশের পুলিশের নিকট আত্মসমর্পণ করেন নরসিংদীর চরাঞ্চল করিমপুরের আলী হোসেন। পরে তাকে থাই পুলিশ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশে ফেরত পাঠায়। আলি হোসেন দালালদের নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে কমবেশি দেড় হাজার লোক আটক রয়েছে। আমাদের ওখানে নেওয়ার পর থেকেই অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। প্রথমে খাবার ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তারপর প্রতি রাতে একটি সুরঙ্গ গর্তের ভিতরে গরুর মতো আমাদের ঢুকিয়ে দেয়া হতো। নড়াচড়ার মতো জায়গা থাকত না। আর দিনে একবার থাইল্যান্ড ,মালয়েশিয়ার দালালরা এসে আমাদের গাছে ঝুলিয়ে পালাক্রমে পেটাতো। এসময় বাড়ির লোকজনকে পেটানোর শব্দ শোনাত। অমানুষিক নির্যাতন সইতে না পেরে ধারদেনাসহ ভিক্ষা করে হলেও টাকা পাঠানোর অনুরোধ জানাতাম স্বজনদের কাছে। এত নির্যাতন করতো, না দেখলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এ বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পরেন আলী হোসেন।  তিনি আরো বলেন, পানির অভাবে ধুকে ধুকে মরতে দেখেছি। তাদের মধ্যে আমার চাচা খোকনও রয়েছেন। মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে জাহাজ থেকে রীতিমতো যুদ্ধ করে জীবিত ফিরে আসা আরেকজন মিঠু দাশ। তিনি বলেন, গত বছরের ১১ জুন একইভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে বঙ্গোপসাগরে খাবার ও পানি নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পাচারকারীদের গুলিতে ৬জন নিহত ও ৪০জন গুলিবিদ্ধ হয়। সেই জাহাজে মালয়েশিয়ার যাত্রী হিসেবে আমিও ছিলাম। ওই ঘটনা মনে পড়লে এখনো চোখ দিয়ে পানি ঝড়ে। রাতে চোখে ঘুম আসে না। তিনি আরো বলেন, দালালদের গুলি খেয়ে আমার পাশে একজন পড়ে আছে। বার বার আমার কাছে পানি চাচ্ছে। কিন্তু আমি পানি দিতে পারিনি। কিছুই করার ছিল না, তাকে পানি দিতে গেলে আমিও গুলি খেয়ে মরতাম।  কিন্তু যাদের তত্ত্বাবধানে এসব তথ্য থাকার কথা সেই কর্মসংস্থান ও জনশক্তি বিভাগ উত্তর দিলেন দায়সারা। বললেন, দেয়ার মতো তাদের কাছে নেই কোন তথ্য। আর অফিসের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জানান, এটা আমাদের কাজ নয়। এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ।তবে দালাল চক্রের সদস্যদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে স্বীকার করে নরসিংদী পুলিশ সুপার আমেনা বেগম (বিপিএম) বলেন, এসব ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যেই দালাল চক্রের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছি। তাছাড়া মানবপাচার সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেসব মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সঞ্জিত সাহা/এসএস/এমএস