জাতীয়

রিপনের বুদ্ধিমত্তায় প্রাণে বাঁচলো ১১৬ যাত্রী

হালকা গড়নের যুবক মো. রিপন। সিরাজগঞ্জের মুহাম্মদ নুরুল ইসলামের ছেলে তিনি। মুখে দাড়ি ও কঙ্কালসার শরীর দেখে যে কেউ প্রশ্ন করবে রোগা এ যুবক কি-ই বা করতে পারবে? কিন্তু এ যুবকই ১১৬ হতভাগার জীবনের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। নিজের বুদ্ধিমত্তায় ভাসন্ত বিশাল ট্রলার চালিয়ে গভীর সমুদ্র থেকে উপকূলে ভিড়িয়েছেন তিনি। আর এ কারণে মৃত্যুর হাতছানি থেকে ফিরে আসা ১১৬ হতদরিদ্র মানুষের চোখে লিকলিকে গড়নের সেই রিপন-ই এখন নায়ক। তার মঙ্গল কামনায় দোয়া করছেন সবাই।১২ মে সেন্টমার্টিনের অদূরে কোস্টগার্ডের হাতে আটক হয়ে ১১৬ মালয়েশিয়াগামীসহ ট্রলারটির তীরে ফিরে আসার নেপথ্য কথাগুলো জানায় যায়। আদালতে দেওয়া মালয়েশিয়াগামীদের অনেকের জবানবন্দিতে এ তথ্য জানা গেছে। উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা রিপনের বুদ্ধিমত্তায় কূলে ফেরার গল্প বলে তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানান।বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা থেকে কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী যাত্রীরা জবানবন্দি দেন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মহিউদ্দিন মুরাদ, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিশাদুদ্দজ্জামান ও অরুণ পাল এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শফিউদ্দিন।আদালত চত্বরে কথা হয় উদ্ধার হওয়া সিরাজগঞ্জের মিলন খন্দকার, বগুড়ার আব্দুর রহমান, ফিরোজপুরের আসিফুর রহমানের সঙ্গে। তারা জানান, ১২ মে দুপুর ১২টার দিকে পাচারকারীরা ১১৬ যাত্রীকে একটি ট্রলারে তুলে দেয়। ট্রলারটি থাইল্যান্ডের মালিকানাধীন। ট্রলারে তুলে দিয়ে সেখান থেকে চালক ও মাঝি নেমে যান। এ অবস্থায় দুঃশ্চিন্তায় পরে যান ট্রলার থাকা যাত্রীরা। গহীন সমুদ্রে নিশ্চিত মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা সবাই। তাদের কান্না আর আত্মচিৎকার শুনে জাহাজে অবস্থানরত পাচারকারী চক্র উল্লাস শুরু করেন। ঠিক এমন সময়, হঠাৎ চলতে শুরু করে ট্রলার। নীরবতা নেমে আসে ট্রলারে। বন্ধ হয়ে যায় পাচারকারীদের উল্লাস। এ সময় খোঁজ নিয়ে জানা যায় পেশাদার কেউ নন, ট্রলারের স্টেয়ারিং ধরে আছে আমাদের মতো এক যাত্রী। হালকা পাতলা রোগা গড়নের ছেলেটি চালাচ্ছেনও ভালো। আর এ দৃশ্য দেখে ট্রলারটি লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে অন্য জাহাজে থাকা পাচারকারীরা। বুদ্ধিমত্তায় ট্রলারের গতি বাড়িয়ে দেয় রিপন। এ সময় পাচারকারীদের গুলি থেকে জীবন বাঁচাতে তিনি ছাড়া বাকি ১১৫ জন ট্রলারে শুয়ে পড়েন। সাগরের অচেনা পথ হাতড়ে দীর্ঘ চার ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে চালক রিপন ট্রলারটি সেন্টমার্টিন দ্বীপের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। পরে কোস্টগার্ড সদস্যরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। কীভাবে এ দুঃসাহসিক কাজ করলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রিপন জানান, আমি মেরিন ডিপার্টমেন্টে পাঁচ বছর চাকরি করেছি। কীভাবে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার চালাতে হয় তা আমার জানা। তবে পথ চেনা ছিল না। জানিনা আল্লাহ পাক কীভাবে সঠিক পথেই আনলেন। তিনি আরো জানান, কূলে ফেরার পথে আরো পাঁচটি ট্রলার সাগরে ভাসতে দেখেছি। শুনেছি দুর্ভোগে পড়া মানুষের আর্তনাদ। এতো সচেতন হয়েও কেন এ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তার এলাকার জাকির দালাল তাকে এবং বন্ধু মিলনকে ১০ দিন আগে কক্সবাজার বেড়াতে নিয়ে আসেন। একদিন নিয়ে যান টেকনাফে। সেখানে দু’বন্ধুকে একজন দালালের কাছে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন জাকির। ওই দালালই জোর করে তাদের মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে তুলে দেন। জাহাজে তারা আট দিন ছিলেন। এতোসব জাহাজ ও বোট সন্দেহজনকভাবে চলাচল করলেও কোস্টগার্ড তল্লাশি না করায় পাচারকারীরা নির্বিঘ্নে এ অপকর্ম চালাতে পারছেন বলেও জানান তিনি। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ জানান, জবানবন্দি শেষে ৭০ জনকে স্বজনের কাছে তুলে দেয়া হয়েছে। বাকিদের নিজ জিম্মায় দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। এছাড়া কক্সবাজারের বাইরের জেলার বাসিন্দাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পুলিশ সহায়তা করবে বলেও জানান তিনি।প্রসঙ্গত, ১২ মে মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় সেন্টমার্টিন থেকে পূর্ব-দক্ষিণ গভীর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমা থেকে ১১৬ মালয়েশিয়াগামীকে ট্রলারসহ উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। পরে ১৩ মে বুধবার সকালে টেকনাফ উপকূলে আনার পর উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের ভাষ্যমতে ৪০ দালালের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মামলা করে কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ড সেন্টমার্টিন স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার ফিরুজ আহমদ বাদি হয়ে এ মামলাটি করেন।সায়ীদ আলমগীর/এআরএ/বিএ/পিআর