দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদের খুশি জমাতে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় কক্সবাজারের মাকের্টগুলোতে ভিড় করছে সব বয়সের মানুষ। প্রতি বছরের মতো এবারও ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ভিনদেশি পণ্য। এর মধ্যে ভারতীয় ও পাকিস্তানি পণ্যের কদর বেশি।
ঈদ উপলক্ষে রমজানের প্রথম সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে সাজানো হয় কক্সবাজারের মার্কেটগুলো। ক্রেতাদের চাহিদা মাথায় রেখে দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি দোকান ভর্তি করা হয় বিদেশি পণ্যে। সব বয়সীদের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, জুতা, সেন্ডেল তোলা হয়। তবে অধিকাংশই পণ্যই আসে চোরাইপথে। বাহারি নামের এসব পোশাকের চাহিদা এবং লাভ অনেক বেশি। তাই ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য মজুদ ও বিক্রিতে বেশি আগ্রহী। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসা এসব পণ্যের আগ্রাসনে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশীয় পোশাক শিল্প। সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব।
কক্সবাজার শহরের নিউ মার্কেট, কোরালরীফ প্লাজা, বড়বাজারের সমবায় সুপার মার্কেট, পৌরসভা মার্কেট, বার্মিজ মার্কেট, বাজারঘাটার আবু সেন্টার, জাফর প্লাজা, এ.ছালাম মার্কেট, রাজস্থান, ফিরোজা শপিং কমপ্লেক্স, প্রধান সড়কের শফিক সেন্টার, ফজল মার্কেট, রশিদ কমপ্লেক্স, ইডেন গার্ডেন সিটি, সি-কুইন মার্কেট, আপন টাওয়ার, কৃষি অফিস রোড সংলগ্ন বিভিন্ন মার্কেটসহ বিভিন্ন শপিং মল ঘুরে দেখা যায় প্রায় সব দোকানে ভারতীয় ও পাকিস্তানি পণ্যের নানা সমাহার।
শুধু এসব মার্কেট নয়, শহরে থাকা বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস এবং উপজেলা পর্যায়ের মার্কেটগুলোতেও রয়েছে ভারতীয় ও পাকিস্তানি পণ্যের উপস্থিতি। ভারতীয় পোশাক চলে নামের গুণে। ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ও বিভিন্ন চরিত্র এবং গানের কলির নামে ক্রেতারা বুদ হয়ে কিনছেন এসব পোশাক।
সমবায় সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, ক্রেতাদের চাহিদার কারণে দোকানগুলোতে ভারত ও পাকিস্তানের নানা ব্যান্ডের থ্রি-পিস ও শাড়ি তোলা হয়।
পাকিস্তানি এম্বার্স, সিমাইয়া, মতিস, রানাস, ইরমস, ফ্লাক, ওয়িজদান, জুধাসহ হরেক রকমের থ্রি-পিসে বাজার ছেয়ে গেছে। তিন থেকে সাত হাজার টাকা দামে এসব পোশাক উৎসাহ নিয়ে কিনছেন ক্রেতারা। আবার দেশি ব্রান্ডের মাঝে বালু চুরি, হ্যান্ডি ব্লক, টাংগাইল, জুট কাতান, সূতি, হাফ সিল্ক ও জামদানি সিল্ক, মুসলিন অ্যামব্রয়ডারি, মুসলিন শিপন, এনডি, বলাকা, জামদানী, ধুপিয়ান, র-কাতান, জয়শ্রী, স্বর্ণ কাতান, মুসলিন ব্রাশো, ঝলক কাতান কিনছেন অনেকে। আর ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে জামদানি, সূতি, টাংগাইল, র-সিল্কের ওপর কাটোয়ার, অ্যামব্রয়ডারি ও এন্ডির মিশ্রণে হাতে বোনা সিল্ক শাড়ি। ক্রেতারা গরমের কারণে এবার সূতি শাড়িকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ঈদ উপলক্ষে এ বছর কয়েক কোটি টাকার বিদেশি পণ্য কক্সাজারের মার্কেটগুলোতে এসেছে। এর ৮০ ভাগই আনা হয়েছে ভারত থেকে। কিন্তু বৈধ পথের পণ্য কম। সরকারি সকল নিয়মকানুন মেনে পণ্য আনতে গেলে তা বিক্রি করে পুঁজি তুলে আনা সম্ভব নয়। তাই শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় পণ্য।
অপর একটি সূত্র জানায়, এভাবে আসা পণ্যের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে হুন্ডিতে। এভাবে কয়েক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে সবার অগোচরে পাচার হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, চোরাই পণ্য বিক্রিতে লাভ বেশি। শুল্ক ছাড়া এসব পণ্যের বাজার মূল্য অনেক কম থাকে। এ কারণে দেশীয় উৎপাদনমুখী শিল্প ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ভারতীয় পণ্যের কাছে মূল্য ও মানে অনেক দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে। এ ছাড়া বৈধ পথে আমদানিকারকরাও এতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। বেশি লাভজনক হওয়ায় বৈধ আমদানির চেয়ে অবৈধ আমদানির দিকেই ঝুঁকছেন তারা।
জানা গেছে, বছরজুড়েই চোরাই পথে দেশে ঢুকে প্রায় শতাধিক ধরণের ভারতীয় পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে- পোশাক, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, বিভিন্ন মশলা জাতীয় পণ্য, শিশুখাদ্য, শুঁটকি, চিনি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ইত্যাদি। তবে ঈদকে সামনে রেখে ভারতীয় কাপড় (ফেব্রিক্স), শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, ওড়না, শাল, পাঞ্জাবি, শার্ট, জুতা, সেন্ডেল ও বিভিন্ন কসমেটিকসের চোরাচালান দেদারছে হয়েছে।
চোরাই পথে ঢুকা এ সব মালামাল ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুদামে মজুদ করা হয়। সেখান থেকে কক্সবাজারের বড় ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য নিয়ে এসে দোকান সাজান। আবার অনেক ব্যবসায়ী টেলিফোনে অর্ডার দিলেই ট্রান্সপোর্টে করে কক্সবাজার পৌঁছে যায় মালামাল। পরে তাদের লোকজন এসে বিক্রির টাকা তুলে নিয়ে যান।
ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতীয় কাপড়ের তুলনায় গুণে ও মানে দেশি কাপড় ভালো। তবে বাজারে ভারতীয় কাপড়ের উপস্থিতি দেশি বাজারের জন্য ক্ষতিকর।
সায়ীদ আলমগীর/আরএআর/এমএস