বছরে দুই বারের বেশি গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ সাধারণত পায় না পোশাক শ্রমিকরা। দুই ঈদেই সাধারণত পরিবার পরিজনদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে আনন্দ কষ্টগুলো ভাগাভাগি করার সুযোগ পান পোশাক শ্রমিকরা। যে দিনগুলোর জন্য পুরো বছর ধরে শত অপেক্ষা আর প্রতিক্ষা সেই দিনের সমষ্টি মাত্র তিন বা চার দিন।
যে প্রিয় গার্মেন্টসের জন্য পরিবার প্রিয়জন আর আত্বীয়স্বজন সবার সঙ্গে হৃদয়ের সকল সংযোগ গুে যেখানে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে, সেখানে এক বছর পর ঈদ উপলক্ষে ছুটি তাও আবার তিন বা চার দিন। যার অনেকের ক্ষেত্রেই যেতে একদিন আসতে একদিন আর পরিবার-প্রিয়জনদের সঙ্গে এক বা দুই দিন।
বহু প্রতিক্ষিত সেই দিনগুলো নিকটবর্তী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন শুরু হয় নতুন এক সংগ্রাম। এ সংগ্রাম নিজের জীবনের বিনিময়ে দুই-তিনটা দিন ছুটি বাড়িয়ে নেয়ার সংগ্রাম। ঈদ উপলক্ষটি নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথেই শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মালিকপক্ষকে অনুরোধ করা হয় “আমরা আপনাদের যে কোনো শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত বিনিময়ে ছুটিটা দুই-তিন দিন বাড়িয়ে দিতে হবে।
প্রিয়জনদের প্রতি দুর্বলতার এ সুযোগকে পুঁজি করে শ্রকিদের সঙ্গে প্রতারণার এক খেলায় মেতে ওঠেন মালিক পক্ষ। ছুটি বাড়িয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওভার টাইম ছাড়া কাজ করিয়ে নেয়া হয় ছুটির দিন বা শুক্রবারগুলোতে। এতে কোনো অভিযোগ নেই সালেহার মতো কোটি গার্মেন্টসকর্মীর।এরপরও একটাই প্রার্থনা মালিকের হৃদয়টা যেন সৃষ্টিকর্তা একটু কোমল করে দেন আর তারা যেন সাত থেকে দশ দিন ছুটির ব্যবস্থা করে দেন।
সবই চলছে ঠিকঠাক মতো। ঈদের ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে শুক্রবার আর সরকারি ছুটির দিনগুলোতে ওভারটাইম ছাড়া দিব্যি কাজ করিয়ে নিচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। ৪-৫টা শুক্রবার কাজ করে আনন্দের জোয়ারে মন ভাষান পোশাক শ্রকিরা। এক এক করে গুনে হিসাব করে বের করেন তারা ঈদে ছুটি পাচ্ছেন দশ দিন। সবাই প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় মালামাল গুছিয়ে নিয়েছেন, সাধ্যমত হয়তো চেষ্টা করেছেন প্রিয়জনদের জন্য কিছু কিনতে। সন্তান, বাবা-মা বা পরিবারের অন্যদের হয়তো ফোনে বলেও দিয়েছেন- আজ রাতে বা কাল সকালেই বাড়ি ফিরছি, ছুটি দিবে দশ দিন। খুব কাছের কিন্তু অস্থায়ী প্রিয় সহকর্মীদের থেকে হয়তো বিদায় নিতেও শুরু করেছেন কেউ কেউ......।
আনন্দঘন যে মুহূর্তে প্রিয় গার্মেন্টস আর প্রিয় সহকর্মীদের বেশ কয়েকদিন না দেখার কষ্টে কপল বেয়ে চলছে অশ্রু বিসর্জন, এমনই এক সময়ে পিএ সিস্টেমে ঘোষণা দেয়া হয়, একটি ছুটির ঘোষণা, আগামী চারদিন পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে কারখানার সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। বিদায়ের এ মুহূর্তে যেন চির বিদায় নিতে ইচ্ছে করছে এই পোশাক শ্রমিকদের।
একদিকে বুক ভরা কষ্ট, হতাশা, স্বল্পদৈর্ঘ্য ছুটির চাপা যন্ত্রণা আর অন্যদিকে টানা একমাস রোজা রেখে সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা/১০টা পর্যন্ত কাজ করা রুগ্ন শরীর নিয়ে মমতা জড়ানো গাঁয়ের বাড়ির পথে পা বাড়ায় এই পোশাক শ্রমিকরা। সামনে তাদের হিমালয় পর্বত যা জয় করতে হবে এই জীর্ণ আর রুগ্ন শরীরেই।
কারখানা থেকে বের হওয়ার পর তাদের জানা নেই কোন পথে কীভাবে কোন যানবাহনেই বা প্রিয় মানুষগুলোর কাছে ফিরবেন তারা। বাস বা ট্রেনের ছাদে কেউবা ট্রাকে বা লঞ্চের অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে যাত্রা শুরু করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পুরো পথ পাড়ি দিয়ে হয়তো ঈদের দিনের ২/১ ঘণ্টা পূর্বে পৌঁছান গাঁয়ের বাড়িতে। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি শেষ না হতেই এরই মধ্যে সুতোয় টান পরেছে, ফিরতে হবে প্রিয় গার্মেন্টসে! আবার সেই কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি শুরু। আবারও একটা জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে ফিরতে হবে চিরচেনা সেই গার্মেন্টসে। অশ্রুসজল প্রিয় বাবা-মা, অতি আদরের প্রিয় সন্তান বিদায়!!!দেখা হবে আবার আগামী ঈদে.........
আসা-যাওয়ার এই পথে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তবে কেউ হয়তো চিরতরে পঙ্গু বা মহামূল্যবান জীবটাই হারিয়ে ফেলেন। বিদ্ধস্থ হয় পরিবার! আমরা হারায় সহকর্মী! আর কারও কিছু তো, যায় আসে না......!!!
আবার এর ব্যতিক্রমও আছে- নরসিংদী জেলার পলাশ থানার কাজিরচর গ্রামের শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে প্রাণ-আর এফএল গ্রুপের চরকা টেক্সটাইল। এ যেন মরুর বুকে প্রাণের স্পন্দন! প্রায় পাঁচ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদচারণায় মুখরিত হয় এখানকার প্রতিটি সকাল। গার্মেন্টস হলেও এ প্রতিষ্ঠান যেন পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতেই জন্ম নিয়েছে।
রমজানের ক্যালেন্ডারের ১৯টি রমজান পেরুতেই পরিশোধ করে দেয়া হয়েছে সকল বোনাস। পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন উপলক্ষে ২৪ তারিখে কর্মস্থল ছাড়বে সকল পোশাক শ্রমিক। এ উপলক্ষে অন্যান্য পোশাক কারখানাগুলো ১০-১৫ দিনের বেতন দিলেও চরকা টেক্সটাইল ২২ তারিখে ২০ দিনের সকল প্রকার পাওনা পরিশোধ করে দিচ্ছে।
ঈদের ছুটির দিনে মালিকের পক্ষ থেকে দেয়া ঈদ উপহার যা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে বাড়তি আনন্দের অন্যতম কারণ। এসময় তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় দুধ, চিনি, চাল, লাচ্ছা সেমাই, প্রাণ আপসহ আরও অনেক নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। এ কারখানার অন্যান্য সুবিধাদির মধ্যে ফ্রি আবাসিক ব্যবস্থা, ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা, এবং মাত্র ১৫ টাকায় সবার জন্যে দুপুরের খাবার প্রদান অন্যতম।
অন্যান্য পোশাক কারখানার পোশাক শ্রমিকরাও আমাদের মতো এমন হাসি আনন্দ আর সুযোগ সুবিধায় কাজ করার সুযোগ পাক এমন প্রত্যাশা এখানকার প্রত্যেকটা শ্রমিকের।
লেখক : পোশাক কর্মীE-mail: rasel.kaium@gmail.com
এমএএস/এমএস