কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলাম। নৌকায় নদী পার হওয়ার সময় দেখি একটি শিশু পানিতে ডুবে যাচ্ছে। লাফিয়ে নদীতে নেমে তীরে টেনে তুলি শিশুটিকে।
এরপর আবার নৌকায় নদী পার হয়ে লোকমুখে শুনতে পাই নদীর তীরে থাকা সালেহা পাগলি সন্তান প্রসব করেছেন। কিন্তু তার কাছে কেউ নেই। পুনরায় নৌকা নিয়ে নদীর ওপার গিয়ে দেখি সালেহা মাটিতে শুয়ে আছেন।
ফুটফুটে নবজাতক তার পাশে হাত-পা নাড়ছে। সন্তান প্রসবের ২২ ঘণ্টা পরও সালেহার গর্ভফুল পড়েনি। শিশুটির নারও কাটা হয়নি। এ অবস্থায় মা-ছেলে দুজনই বেঁচে আছেন।
এর আগে যে ছেলেটি পানিতে পড়েছিল সেও নাকি সালেহার ছেলে। সত্যিই আল্লাহ সালেহার সঙ্গে রয়েছেন। তা না হলে কি এতো দুর্ভোগের মধ্যে সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকেন সালেহা।
কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের নবগ্রাম গ্রামের বাসিন্দা ও আতুল্যা বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী শামসুল আলম।
এলাকাবাসী জানায়, নবগ্রাম গ্রামের তাজ উদ্দিনের মেয়ে সালেহা আক্তারের স্বামী পাশের আরোহা গ্রামের মোস্তফা খান প্রায় সাত বছর আগে মারা যান। এরপর থেকে তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী।
গত পাঁচ বছর ধরে সালেহা নবগ্রাম খেয়াঘাটের দক্ষিণ পাশে খোলা জায়গায় বসবাস করছেন। সেখানে চারদিকে বাঁশ দিয়ে ঘেরা পলিথিনের ছাউনি রয়েছে। ছাউনির ভেতর একটি মশারি টাঙিয়ে তার ভেতর দিনযাপন করেন সালেহা। এলাকাবাসী তাকে সালেহা পাগলি বলে চেনেন।
শনিবার (১ জুলাই) সরেজমিনে সালেহার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মাথায় ছোট ছোট চুল। গলায় সুতা ও একটি মালা রয়েছে। পরনে ছেঁড়া জামা ও কাপড়। নিজের পরিচয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন সালেহা। এরপর মাথা নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চান।
সালেহা জানান, তার স্বামীর নাম মোস্তফা খান। সদ্য জন্ম নেয়া নবজাতকসহ তিন ছেলে-মেয়ে রয়েছে তার। স্বামী মারা গেছেন সাত বছর আগে।
সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানের বাবার পরিচয় জানতে চাইলে সালেহা বলেন, এই সন্তানের বাবার নাম হারুন। বাড়ি সূত্রাপুরের ধামরাই থানায়। এখানে আসার পর হারুনের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তার সঙ্গে বিয়ে হয়। হারুন শাকের ব্যবসা করেন। কয়েক মাস হয়েছে হারুন এখন আর এখানে আসেন না। এরপর আর কোনো কথা বলেননি সালেহা। শুধু এদিক-সেদিক তাকাচ্ছেন।
আতুল্যা বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী শামসুল আলম জানান, গত ২৮ মে সন্ধ্যায় সালেহা ছেলেসন্তান প্রসব করেন। পরদিন ২৯ মে দুপুরে তিনি ঘটনাটি জেনে উয়ার্শী ইউনিয়নের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী মোর্শেদা আক্তারকে খবর দেন। তারা দুজন সালেহার থাকার জায়গার পাশে একটি কাঠবাগানে সালেহাকে নিয়ে পরিচর্যা করেন।
নবগ্রামের পরিবার কল্যাণ সহকারী প্রতিমা রানী ঘোষ বলেন, মা ও শিশু দুজনই সুস্থ আছেন। শিশুটি মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে। বর্তমানে সুস্থ রয়েছে তারা।
উয়ার্শী ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক তাপস মজুমদার জানান, সালেহাকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রদান করা হবে। তবে স্বামী না থাকায় কি ধরনের পদ্ধতি দেয়া হবে তা এখনও নির্ধারণ করা যায়নি।
মির্জাপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সালেহাকে তিনি ও জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপ-পরিচালক লুৎফুল কিবরিয়া প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। এলাকার স্বাস্থ্য কর্মীরা সার্বক্ষণিক তার পরিচর্যা করছেন।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত সাদমীন জানান, সালেহার ১১ শতক জায়গা তার বোনের স্বামী দখল করে রেখেছেন বলে তিনি শুনেছেন। খুব দ্রুত ওই জমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেবেন তিনি। সালেহা ও তার তিন সন্তানের অধিকার রক্ষার চেষ্টাও করবেন তিনি।
এছাড়া আজ প্রাথমিকভাবে সালেহাকে থাকার জন্য নাগরপাড়া বাজারের পাশে একটি ঘর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এস এম এরশাদ/এএম/জেআইএম