দেশজুড়ে

প্রশ্নবিদ্ধ ‘বন্দুকযুদ্ধ’ থেকে পিছু হটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ

মাদক নির্মূল করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী নিহতের ঘটনায় কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত ছিল গত ৭ ফেব্রুয়ারি জেলা শহরের কান্দিপাড়া এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী আল আমিনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা। 

মাদক ব্যবসায়ীদের দু'পক্ষের গোলাগুলিতে আল আমিন নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ দাবি করলেও পরিবারের অভিযোগ ছিল পুলিশ ৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বাড়ি থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে রাতে আল আমিনকে গুলি করে হত্যা করে। অবশ্য এ ঘটনায় সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে হত্যা মামলাও দায়ের করে নিহত আল আমিনের পরিবার।

শুধু আল আমিন নয়, পরবর্তীতে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত আরও কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর পরিবারেরও একই অভিযোগ ছিল। তাদের প্রত্যেককেই পুলিশ বাড়ি থেকে আগে ধরে নিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে গুলি করে হত্যা করে গণমাধ্যমে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে প্রচার করে বলে অভিযোগ নিহতের স্বজনদের। 

মাদক ব্যবসায়ীদের মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলো বরাবরই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এবার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ নয় বরং তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আত্মসমপর্ণ করার সুযোগ দিচ্ছে জেলা পুলিশ। ইতোমধ্যে প্রায় আড়াইশো মাদক ব্যবসায়ী, মাদক পাচারকারী ও মাদকসেবী জেলা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

তবে বন্দুকযুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের মৃত্যু ও আত্মসমর্পণের পরও জেলার বিজয়নগর ও আখাউড়া উপজেলায় এখনো মাদকের ছড়াছড়ি। সীমান্তবর্তী এ দুই উপজেলায় হাত বাড়ালে মিলছে মাদক।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের নোয়ামোড়া গ্রামের ইদ্রিস মিয়ার ছেলে নাছির মিয়া নিখোঁজ থাকায় পরিবারের সদস্যরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। নাছির মিয়া ‘বন্দুকযুদ্ধের’ গ্যাঁড়াকলে পড়তে পারেন বলে পরিবারের লোকজনের মধ্যে ভয় ঢোকে। এ অবস্থায় গত ২ জুলাই ইদ্রিস মিয়ার পরিবারের সাত সদস্য পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের কাছে তার কার্যালয়ে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। ওই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে।

৯ জুলাই জেলার কসবা উপজেলার গোপিনাথপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য ও ৭ মামলার আসামি জাকির হোসেনও আত্মসমর্পণ করেন পুলিশ সুপারের কাছে। পরদিন ১০ জুলাই জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার চরচারতলা গ্রামের বাসিন্দা ও ১০ মামলার আসামি বাবুল সরকার আত্মসমর্পণ করেন।

সর্বশেষ গতকাল ১৮ জুলাই পুলিশ সুপারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন জেলার আখাউড়া উপজেলার আরেক মাদক ব্যবসায়ী মো. ইকবাল। তার বিরুদ্ধে জেলার কসবা ও কুমিল্লার মুরাদনগর থানায় ৫টি মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগ ৭টি মামলা রয়েছে।

এর আগে গত ৫ মে জেলার আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ আয়োজিত এক জঙ্গিবাদ ও মাদক বিরোধী সমাবেশে ২২২ জন মাদক ব্যবসায়ী, মাদক পাচারকারী ও মাদকসেবী আত্মসমর্পণ করেন।

তবে বন্দুকযুদ্ধ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণে নয় বরং মাদক ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্যই আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। তার মতে, মদাক নির্মূলে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ।মাদকের বিরুদ্ধে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মাদক নির্মূলে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। তবে পুরোপুরি নির্মূলের জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বতর্স্ফূত অংশগ্রহণ রয়েছে। 

প্রশ্নবিদ্ধ বন্দুকযুদ্ধ থেকে পুলিশ পিছু হটে আত্মসমর্পণের দিকে ঝুঁকছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টিকে এভাবে বলা যাবে না। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ ছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে সংঘাতের কারণেও কয়েকজন মারা গেছে। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক অবশ্যই ছিল, তবে আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে পুলিশের চেয়ে বেশি স্থানীয়দের অংশগ্রহণ রয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূলের জন্য সরকারিভাবে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে ভালো চিকৎসা হয় না। মাদকসেবীরা সুস্থ্য জীবনে ফিরে আসলে তাদের চাহিদা থাকবে না, এতে করে মাদক ব্যবসাও এক সময় বন্ধ হয়ে যাবে।

আজিজুল সঞ্চয়/এফএ/এমএস