দেশজুড়ে

১৯ দিনে চার শিশু অপহরণের নেপথ্যে কী?

গত ১৯ দিনে শরীয়তপুর সদর ও সখিপুর উপজেলায় চার শিশুর অপহরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর তাই শিশু সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন শরীয়তপুরের অভিভাবকরা।

পুলিশ, স্থানীয় ও শিশুদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের রিপন বেপারীর ছেলে নুর আলম রাব্বি (১৩) নানাবাড়ি বালাখানা থেকে নিজ বাড়িতে আসার সময় কুড়াশি দিঘির পাড় থেকে অপহৃত হয়।একটি মাইক্রোবাসে করে কিছু লোক মুখ চেপে ধরে নিয়ে যায় তাকে। পথে গাড়ি বিকল হয়ে গেলে নুর আলম সেই ফাঁকে পালিয়ে যায়।

নুর আলম রাব্বি জানায়, গত ২২ জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় পালং ইউনিয়নের বাঘিয়া গ্রামে নানাবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে আসার সময় কুড়াশি দিঘির পাড় নড়িয়া-শরীয়তপুর সড়কে একটি মাইক্রোবাস তার সামনে এসে দাঁড়ায়।মাইক্রোবাসের লোকেরা রাস্তা থেকে একটি টাকার বান্ডিল উঠিয়ে দেয়ার জন্য বললে রাব্বি উঠাতে যায়। তখন তারা রাব্বির মুখ চেপে ধরে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। তবে গাড়ি প্রেমতলা দক্ষিণ দিকের সড়কে ঢুকলে বিকল হয়ে যায়।

সেসময় অন্ধকারে রাব্বির দু’পাশের দুজন নিচে নামলে এক ফাঁকে রাব্বি পালিয়ে যায়। মাইক্রোবাসটিতে মুখোশ পরা তিনজন লোক ছিল। পরদিন ২৩ জুলাই রোববার সকালে রাব্বির বাবা রিপন বেপারী পালং মডেল থানায় এ বিষয়ে একটি জিডি করেন।

এদিকে সখিপুর থানার ওহাব ঢালীর কান্দি গ্রামের নান্নু খানের ছেলে সিয়াম মাহমুদ আরাফাত (১৩)। গত ৭ জুলাই বাড়ি থেকে মাদরাাসায় যাওয়ার সময় নিখোঁজ হয়। এখনো তাকে পাওয়া যায়নি। এলাকার জনগণ ও সিয়ামের পরিবারের ধারণা শিশু পাচারকারীরা তার ছেলেকে নিয়ে যেতে পারে। এ ঘটনায় আরাফাতের বাবা ১৩ জুলাই সখিপুর থানায় একটি জিডি করেছেন।

এছাড়া সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের উত্তর ভাষানচর গ্রামের ইদ্রিস মাদবরের ছেলে ওসমান মাদবর (১৩) গত ২৩ জুলাই রোববার বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়ে পশ্চিম ভাষানচর মাদরাসা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়।

ওসমানকে না পেয়ে তার পরিবার প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজাখুঁজি করে। পরে গত ২৫ জুলাই সোমবার সন্ধ্যায় আংগারিয়া ইউনিয়নের উত্তর ভাষানচর গ্রামের নতুনহাট বাজারের উত্তর পাশের একটি আখ খেতের পানিতে ওসমানের মরদেহটি স্থানীয়রা ভাসতে দেখে।

পরে স্থানীয়রা ওসমানের পরিবার এবং পালং মডেল থানার পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে সোমবার রাত ৮টার দিকে ওসমানের মরদেহটি উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

পরে মঙ্গলবার সকালে ময়নাতদন্ত করা হয়। এ ঘটনায় ওসমান মাদবরের বাবা ২৫ জুলাই পালং মডেল থানায় একটি মামলা করেছেন। ওসমানের মরদেহের ময়নাতদন্তকারী সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আকরাম এলাহী ময়নাতদন্ত শেষে জানিয়েছেন, ওসমানের গলা কাটা ছিলো, বামচোখ উঠানো ছিল এবং রক্তনালী, শ্বাসনালী কাটা ছিল।

সর্বশেষ আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা লিজা আক্তার (১৩)। ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার সরদার কান্দি গ্রামের লেহাজ উদ্দীন শেখ মেয়ে লিজা আক্তার গত ১৫ জুলাই শনিবার বিকেলে স্কুলছুটির পর বাইসাইকেল নিয়ে বাড়ির সামনের রাস্তায় বের হয়। সন্ধ্যা হয়ে গেলে বাড়িতে না ফেরায় খোঁজাখুঁজি করে তার পরিবার।

আটদিন পর গত ২২ জুলাই শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সখিপুর ইউনিয়নের ছৈয়ালকান্দি গ্রামের একটি পাট খেতের পানিতে লিজার মরদেহটি ভাসতে দেখে স্থানীয়রা। সখিপুর থানায় খবর দিলে লিজার মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহের ময়নাতদন্ত করার জন্য মরদেহটি শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় লিজা আক্তারের বাবা ২৩ জুলাই রোববার লেহাজ উদ্দিন শেখ সখিপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এ ঘটনায় লিজার নিজ বাড়ির ফরিদ শেখ (৩০) ও জাকির শেখ (৪০) এ দু'জনকে আটক করেছে পুলিশ।

লিজার মরদেহটি শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকৎসক সুমন কুমার পোদ্দার বলেন, মরদেহে পচন ধরায় কিডনি, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও জরায়ুসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পাওয়া যায়নি।

অপহরণ ও মরদেহের এমন আতঙ্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে জেলার এলাকাগুলোতেও। ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা। শিশু পাচারকারী দলের সদস্যরা শিশুদের অপহরণ করে এ কাজ করেছে বলে স্থানীয় জনগণের ধারণা।

এ বিষয়ে সখিপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম মঞ্জরুল হক আকন্দ বলেন, লিজার হত্যার ঘটনায় জড়িত দুজনকে আটক করেছি। আর সিয়াম মাহমুদ আরাফাতের মাদরাসায় পড়ার প্রতি অনিহা ছিল। আগেও সে কয়েকবার মাদরাসা থেকে পালিয়েছে। আমরা আরাফাতকে খুঁজছি। ইতিমধ্যে মাইকিংও করেছি।

পালং মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খলিলুর রহমান বলেন, আমি বুধবার রাব্বির বাড়িতে গিয়েছিলাম। রাব্বিকে মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যাওয়ার যে ঘটনা শুনলাম বিষয়টি শুনে ভিন্ন ও কঠিন মনে হল। আমরা তদন্ত করছি ঘটনাটি কারা ঘটিয়েছে। এদিকে ওসমানের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।

জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. এহসান সাহ বলেন, লিজার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আর তিনজনের ব্যাপারে তদন্ত চলছে। আসা করছি খুব শিগগিরই সমস্ত ঘটনা বের হয়ে আসবে।

মো. ছগির হোসেন/এফএ/এমএস