বাংলাদেশের রেলওয়েকে আধুনিকায়ণ করতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের কাজও শেষ হয়েছে। আবার কয়েকটি প্রকল্প প্রকৃয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সঠিক ও সময় মতো বাস্তবায়ণ হলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের চেয়ার পাল্টে যাবে। এই উন্নয়নের অংশ হিসেবে নতুন কোচ ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ থেকে শুরু করে নতুন রেললাইন নির্মাণ, ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ, পুরনো ও জরাজীর্ণ রেললাইনকে সংস্কার করার কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। রেলের ক্রমবর্ধমান উন্নতি প্রসঙ্গে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রেল ছিল অবহেলিত। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা রেলের প্রতি বিশেষ নজর দেন এবং আলাদা রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এখন রেলের উন্নয়ন কাজ চলছে।রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রেলকে গতিশীল করতে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ২০০৯ সালে ২৭ হাজার ৩৯৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৬টি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে। এর মধ্যে ১৮ হাজার ২৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৯টি সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদিত হয়। যার মধ্যে এ পর্যন্ত মোট ২৪টি প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে। রেলওয়ের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৩ সালের জুনে নেয়া হয় দীর্ঘ মেয়াদি মহাপরিকল্পনা। এর মধ্যে রয়েছে প্রস্তাবিত পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে পৃথক ডুয়েল গেজ ডাবল লাইনের রেলওয়ে সেতু নির্মাণ, দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-গুনদুম ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন নির্মাণ, ঢাকা-কুমিল্লা হাইস্পিড স্ট্যান্ডার্ড গেজ রেললাইন নির্মাণ, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ মেগা প্রকল্প অন্যতম।রেল সূত্র জানায়, মেগা প্রকল্পের মধ্যে সবার আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনকে। দেশের অভ্যন্তরীণ মালামাল ও যাত্রী পরিবহন খাতে আয়ের প্রধান অংশই হচ্ছে এই পথ। এ ছাড়া এটি আঞ্চলিক, উপ-আঞ্চলিক এবং ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের ৩২০ দশমিক ৭৯ কিলোমিটারের মধ্যে ডাবল লাইন আছে মাত্র ১১৭ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার। বাকি অংশকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার কাজ শুরু করে সরকার। ইতিমধ্যে জাপান কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে লাকসাম থেকে চিনকি আস্তানা পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটার রেলপথ ডাবল লাইন করা হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী এটি উদ্বোধন করেছেন। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, লাকসাম থেকে আখাউড়া সেকশনে ৭২ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য এডিবি এবং ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পটি গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর অনুমোদন দিয়েছে একনেক। ইতোমধ্যে প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের কাজ ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরো ৫৭১ দশমিক ৩০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সরকারি অর্থায়নে তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু-পূর্ব পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ হয়েছে। আর সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত নতুন ৭৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এবং পাচুরিয়া-ভাঙ্গা সেকশনের পুকুরিয়া থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ আগামী বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এলওসির অর্থায়নে খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত ৬৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি ও অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে। এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র এবং সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রকল্পটি ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার কথা। এ ছাড়া সরকারি অর্থায়নে কাশিয়ানি-গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত ৫০ দশমিক ৪১ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত প্রকল্পটি একনেক অনুমোদন দিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১২৮ দশমিক ২৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মিত হবে। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ নির্মাণের জন্য ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা ৮২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার এবং ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর ৮৪ দশমিক ০১ কিলোমিটার নতুন ব্রড গেজ রেলপথ নির্মিত হবে। প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে ইতিমধ্যে চায়না রেলওয়ে প্রুপের (সিআরইসি) সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের নন-বাইন্ডিং এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পার্বতীপুর-কাঞ্চন-পঞ্চগড় এবং কাঞ্চন-বিরল পর্যন্ত ১৩৯ কিলোমিটার মিটার গেজ রেললাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের কাজ প্রায় শেষ দিকে। এর বাইরে পুরাতন রেললাইন সংস্কারের কাজও চলছে। ইতিমধ্যে ৮৮৯ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসনের কাজও শেষ হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়েতে লোকোমোটিভ ও যাত্রীবাহী কোচের সংকট দীর্ঘদিনের। এই সংকট দূর ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে রেল মন্ত্রণালয় নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ ক্রয় করছে। ইতিমধ্যে ২০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়া ভারতীয় ডলার ক্রেডিট লাইনের বিপরীতে ২৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ, ১৬৫টি ব্রডগেজ ওয়েল ট্যাংক ওয়াগন ও ছয়টি ব্রডগেজ ব্রেক ভ্যান, ১৭০টি মিটার গেজ ফ্লাট ওয়াগন ও ১১টি ব্রেকভ্যান এবং ৮১টি মিটারগেজ ওয়েল ট্যাংক ওয়াগন ও পাঁচটি ব্রডগেজ ব্রেক ভ্যান পাওয়া গেছে। আর জিওবি অর্থায়নে ৫০টি ওয়াগন সংগ্রহ করা হয়েছে। এ দিকে ভারতীয় ঋণের আওতায় ১২০টি ব্রড গেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহও প্রক্রিয়াধীন। ইডিসিএফ, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে ২০টি, এডিবি অর্থায়নে ১০টি এবং সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ৭০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। এসকেডি/এমএস