দেশজুড়ে

আদালতের কাঠগড়ায় ৮ বছরের শিশু

নুরানি মাদরাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী খাইরুল আমিন। বর্তমানে তার বয়স ৮ বছর ৯ মাস। ২০১৪ সালের একটি মাদক মামলার আসামি হিসেবে জামিন নিতে আদালতে এসে হৈ চৈ ফেলে দেয় শিশুটি।

কিন্তু আদালত প্রাঙ্গণে শত শত মানুষ দেখে ছেলেটি বাবার হাত ছাড়ে না। কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে মুখ লুকিয়ে রাখে। জীবন সম্পর্কে কিছু বুঝে উঠার আগেই অন্যান্য দাগি আসামির মতো তাকে জামিন নিতে আদালতে আসতে হলো।

মাদক মামলায় শিশু আসামির জামিন নিতে আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে কৌতূহল বেড়ে যায় আদালত পাড়ার সাধারণ মানুষের।

সোমবার দুপুর ১২টায় কক্সবাজার যুগ্ম-জেলা ও দায়রা জজ-১ সালমা খাতুনের আদালত আসামি পক্ষের শুনানি শেষে শিশুটির জামিন হয়।

আদালত তদন্ত কর্মকর্তার শোকজ চেয়ে আর একটি আবেদন করার জন্য আসামির আইনজীবীদের আদেশ দেন। বিকেল পৌনে ৫টায় খাস কামরায় আসামি খাইরুল আমিনকে ৫ হাজার টাকার বন্ড নিয়ে বাবার জিম্মায় জামিন দেয় আদালত।

আসামি খাইরুল আমিন মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী উত্তরকুল এলাকার প্রবাসি শামসুল আলমের ছেলে। আসামির আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহেদ নেওয়াজ বলেন, এটি দুঃখজনক এবং ঘৃণ্য ঘটনা।

তদন্ত কর্মকর্তা হয়তো মোটা অংকের টাকা নিয়ে মাদক মামলায় শিশুটির নাম দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকার এবং শিশু অধিকার লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, যে বয়সে শিশুটির স্কুলে যাবার কথা, সে বয়সে তাকে আদালতে মামলা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আমরা বিজ্ঞ আদালতকে বিষয়টি বুঝাতে সক্ষম হয়েছি। বাবার জিম্মায় ৫ হাজার টাকার বন্ড নিয়ে তাকে জামিন মঞ্জুর করেছে।

মামলার এজাহারে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট ছোট মহেশখালী এলাকার কোন্দকার পাড়া জামে মসজিদের সামনে থেকে ৮০ লিটার চোলাই মদসহ ৬ জনকে আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনায় ৬ জনের বিরুদ্ধে মাদক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। এ মামলার তালিকাভুক্ত ৩ নং আসামি ছোট মহেশখালী উত্তরকূল এলাকার প্রবাসি শামসুল আলমের শিশু ছেলে খাইরুল আমিন। কিন্তু মামলায় তার বয়স দেখানো হয় ২০ বছর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদক উদ্ধার ঘটনায় অন্যান্য আসামিদের সাথে একই এলাকার জনৈক ফরিদুল আলমের ছেলে সরওয়ার আলমকে আটক করা হয়েছিল। সরওয়ার ৫ মাস জেলও খেটেছে। কিন্তু সরওয়ার বাদীর কাছে নিজেকে খাইরুল আমিন পরিচয় দিয়েছিল। আর সে নামেই মামলা করেন বাদী।

পরবর্তীতে নিজের আসল পরিচয় নিয়ে জামিনে বেরিয়ে আসে সরওয়ার। বিষয়টি জানাজনি হলে আসল রহস্য বেরিয়ে আসে। এরপরও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিকাশ চক্রবর্তী টাকার বিনিময়ে ৫ বছরের শিশু খাইরুল আমিনের নাম রেখেই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন।

শিশুটির বাবার অভিযোগ, কোনো তদন্ত ছাড়াই অফিসার আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছেন। ফলে আমার শিশুটি মামলার ৩ নং আসামি হয়ে আদালতে এসেছে। বর্তমানে আমার ছেলে খাইরুল আমিনের বয়স ৮ বছর ৯ মাস। আমি এ ঘটনার আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে, মহেশখালী আজিজুল উলুম মাদরাসার শিক্ষক নুর মোহাম্মদ বলেন, খাইরুল আমিন মাদরাসার নুরানি বিভাগের নিয়মিত ছাত্র। তার রোল ২৮। ভালো করে কথাও বলতে না পারা এক শিশুর নামে এ ধরনের মিথ্যা মামলা কোনোভাবে কাম্য নয়।

মামলার বাদী এসআই আবু জাফর দুই বছর আগের ঘটনা এখন মনে নেই উল্লেখ করে বলেন, মাদক নিয়ে যাদের আটক করা হয়েছিল তাদের নামে মামলা করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (বর্তমানে নোয়াখালী কবির হাট থানায় কর্মরত) বিকাশ চক্রবর্তী জানান, বাদী কাকে আসামি করেছে তা আমি জানি না। আমি তদন্ত করেই চার্জশিট দিয়েছি। এখানে কোনো শিশুকে আসামি করা হয়নি। আদালত আমার কাছে জানতে চাইলে আমি জবাব দেব বলেও জানান তিনি।

বিষয়টি জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরুজুল হক টুটুল বলেন, এটি জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সায়ীদ আলমগীর/এএম/আরআইপি