দেশজুড়ে

কুড়িগ্রামে বানভাসিদের ত্রাণের টাকা আত্মসাৎ

কুড়িগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণের দেয়া লাখ লাখ টাকা প্রতারণা করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের কর্মকর্তাসহ সাবেক ইউপি সদস্য আত্মগোপন করেছেন।

এবার কুড়িগ্রামে দ্বিতীয় দফা বন্যায় ৬২টি ইউনিয়নের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর মধ্যে নদীভাঙনে গৃহহীন হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার পরিবার। বানভাসি মানুষদের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ছাড়াও অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণসহায়তা হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুক্তাদির চৌধুরী জেলার ভিটেমাটিহারা ৫১টি পরিবারকে দুই ক্যাটাগরিতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিতরণ করেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।

গত শনিবার ঘর-বাড়ি মেরামতসহ মাসের খাদ্যসহায়তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণাবিমুখ ব্যবস্থাপনা পরিচালক দুস্থ পরিবারগুলোকে ৫০-৬০ হাজার টাকা দেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সিন্ডিকেট চক্র প্রতারণা করে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এতে প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের কুমারপাড়ার সৈয়দ আলীর স্ত্রী কাঞ্চনমালা (৩৮), ধনারবি দাসের স্ত্রী মালতি রবিদাস (৪০), নেছাব উদ্দিনের স্ত্রী আজিরন বেগম (৫২), মহিলা বেগম (৪৫), কদমতলা গ্রামের ভগলু হোসেনের ছেলে আবুল হোসেন (৪৮), মৃত রাজেনের স্ত্রী স্বরবালা (৪৫), আবির উদ্দিনের স্ত্রী ছবিরন নেছা (৫০), অনন্তুপুর ঘাটে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত কফুল্লা আলী (৭০), অন্যের জমিতে আশ্রিত পালপাড়ার মৃত. মোহনের স্ত্রী ছবিতারাণী দাস (৫২), তাঁতীপাড়ার মৃত কানুর স্ত্রী বৃন্দেশ্বরীসহ ১০ জন দরিদ্র পরিবারের সদস্য।

প্রতারণার স্বীকার বৃদ্ধ কফুল্লা আলী বলেন, ‘এবারের বন্যায় চরের মধ্যে হামার বাড়ি-ঘর সউগ ভাসি গেছে। ঘাটের কাছে মানষের ছাপড়া ঘরে কোনো রকমের আছং। শনিবার সকালে সাহেব আলী মোক ডাকে নিয়া কয় চল বাহে চাচা রংপুর যামো। অটে গেলে এক অফিসার তোমাক টাকা দিবে। মাইক্রোত করি নিয়া গেল নাস্তা করেয়া। রংপুরের যায়া একটা অফিস থাকি দুটা লোক আসি মোক গাড়িত থাকি নামাইল। মোক ধরি তিন কি চার তালার উপর তুলি ধরিয়া। পরে একটা লোক আসি টাকার একটা খাম দিয়া কইল চাচা বাহে এই খামত অনেক টাকা আছে দিবেন না কাকো। হামরা দশ জন টাকা নিয়ে আসার সময় সাহেব আলী সবার কাছ থেকে খাম নিয়া একটা খাম ছিড়ে তিন হাজার করি টাকা দেয়। বাকি খামগুলা ব্যাগের মধ্যে রেখে দেয়।’

এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকে সাহেব আলী মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপন করেন।

ঢাকা-মেট্রো-গ-১৪১১৮৮ নাম্বারের মাইক্রোবাসের চালক আনোয়ারুল জানান, গত শনিবার সকালে সাহেব আলী আমার মাইক্রোটি দু’হাজার টাকায় ভাড়ায় নেন। সন্ধ্যার দিকে ফেরার পথে সাত মাথার ওখানে এসে খাবারের জন্য আমাকে ১২০ টাকা দেয়। তবে গাড়িতে টাকা বণ্টনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের রংপুর ডিস্ট্রিবিউশনে কর্মরত আবুল কালাম আজাদ জানান, আমাদের এমডি কবে এসে টাকা দিয়েছেন তা আমার জানা নেই। আমি ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে থাকায় এ বিষয়ে কোনো কিছু বলতে পারব না। এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের এরিয়া ম্যানেজার মাইনুল সাহেব ভালো জানেন।

কুড়িগ্রামের দায়িত্বে থাকা এরিয়া ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম ঘটনাটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মোবাইলে জানান, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। অফিস থেকে তালিকা করে তারা টাকা দিয়েছে। কারা তালিকা করেছে এবং কত টাকা দেয়া হয়েছে প্রশ্ন করলে তিনি ফোন কেটে দিয়ে বন্ধ করে রাখেন।

এ ব্যাপারে হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনা শোনার পর আমি সাহেব মেম্বারকে ফোন দিলে তিনি জানান, ৫০ হাজার টাকা না ১০ হাজার টাকা ছিল খামের মধ্যে। সবাইকে তিন হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বাকি টাকা যাতায়াতের জন্য খরচ হয়ে গেছে। তবে এই টাকা আত্মসাৎ করার পেছনে একটা সিন্ডিকেট কাজ করেছে। যাদের জন্য এই ইউনিয়নের একটি বদনাম হয়ে গেল। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, প্রচারণাবিমুখ দাতা সংস্থা বা ব্যক্তিগণকে সাহায্য করার আগে প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে বণ্টন করার পরামর্শ দেন তিনি।

নাজমুল/এমএএস/আইআই