কড়া নাড়ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। তাই নাওয়া-খাওয়া ভোলার অবস্থা রনজিৎ পালের। প্রতিমা কারিগর রনজিৎ পালের ৪৭ বছরের প্রেম-ভালোবাসা, নেশা-পেশা সবই প্রতিমা ঘিরে। উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও কি এক সম্মোহনে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন প্রতিমার সঙ্গে। চাকরির চেষ্টাও করেননি। কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রনজিৎ পালের পরিচিতি প্রতিমা তৈরির নিপূণ কারিগর হিসেবেই।
জল আর কাদামাটির মিশ্রণে মনের রঙ মিশিয়ে নিপূণ হাতের ছোঁয়ায় রনজিৎ পাল তৈরি করেন প্রতিমা। এ পেশাই তাকে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য।
রনজিৎ পাল স্বাধীনতার পর থেকে কিশোরগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তার বাড়ি শহরের বত্রিশ এলাকায়। তবে আদি নিবাস মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর গ্রামে। ওই গ্রামের মৃত গৌরাঙ্গ চন্দ্র পাল ও যোগমায়া পালের ছেলে রনজিৎ।
রনজিৎ পালের বাবা ছিলেন সে সময়কার একজন প্রসিদ্ধ মৃৎশিল্পী। বাবার কাজে সহযোগিতা করতে করতেই একসময় নিজের অজান্তে জড়িয়ে পড়েন এ পেশায়। শ্রীনগর ডিগ্রি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর বিভিন্ন চাকরির সুযোগ এসেছে। কিন্তু স্বাধীনচেতা রনজিৎ পালের কাছে শিকলে বাঁধা জীবন ভালো লাগত না।
স্বাধীনতার আগে বাবার সঙ্গে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন মন্দিরে প্রতিমা তৈরি করতে আসতেন রনজিৎ। বাবার কাজে টুকটাক সহযোগিতা থেকেই এক সময় মৃৎশিল্পের নেশায় মগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। বাবার মৃত্যু হলে স্বাধীনতার পর স্থায়ীভাবে আবাস গড়েন কিশোরগঞ্জে। সেই থেকে তৈরি করে চলছেন প্রতিমা।
দুর্গাপূজা ছাড়াও হিন্দুদের সব ধরনের পূজার প্রতিমা তৈরি করেন রনজিৎ পাল। তার পাকা হাতের ছোঁয়ায় প্রতিমার গায়ে ফুটে ওঠে শৈল্পিক সৌন্দর্য। তাইতো পূজার মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করতে হয় তাকে। দুর্গা, কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক, গণেশ, জগদ্বাত্রী, রাধা-কৃষ্ণসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করেন রনজিৎ পাল।
কিশোরগঞ্জ ছাড়াও সিলেট, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা তৈরির কাজ করেন তিনি। তবে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয় দুর্গাপূজার মৌসুমে। এ সময় কয়েক লাখ টাকা উপার্জন করেন তিনি।
প্রতিমা শিল্পী রনজিৎ পালের তিন ছেলে, এক মেয়ে। প্রতিমা তৈরির উপার্জনে সংসার চালিয়েও তিনি ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন।
৬৭ বছর বয়সী রনজিত পাল পেশার ক্ষেত্রে খুবই মনোযোগী। পূজার মৌসুমে তার দেখা মেলা ভার। দিন-রাত সময় কাটছে প্রতিমা তৈরিতে। এ সময়টাতে বাবার সঙ্গে সহযোগিতা করছেন ছেলে রাজিব পাল।
জাগো নিউজকে রাজিব পাল বলেন, বাবা বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলে রনজিৎ সেনের বাড়িতে প্রতিমা তৈরি করছেন। ব্যক্তিগত এ মণ্ডপে কাজ করছেন ৬০ হাজার টাকার চুক্তিতে। আমি আমার বাবাকে নিয়ে গর্বিত। বাবার পেশা ধরে রাখতে চাই। লেখাপড়া শেষ করেছি। হয়তো কোনো চাকরি করব। তবে প্রতিমা গড়ার শৈল্পিক কাজটি শৌখিনভাবে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।
রনজিৎ পাল বলেন, এ পেশায় কঠোর পরিশ্রম হলেও সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। প্রতিমা তৈরির কাজ এখনও শিল্পের স্বীকৃতি পায়নি। অনেকে এ পেশাকে অবহেলার চোখে দেখে। তবে রক্তের সঙ্গে এ পেশা মিশে গেছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিমার সঙ্গেই থাকতে চাই।
তবে প্রতিষ্ঠিত এ মৃৎশিল্পী চান না তার সন্তানেরা এ পেশায় আসুক। আবার যে পেশা তাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে, দিয়েছে জীবন-জীবিকার সন্ধান সেটাকে কেউ অবহেলার চোখে দেখুন সেটাও চান না রনজিৎ পাল।
নূর মোহাম্মদ/এফএ/আরআইপি