দেশজুড়ে

বদলি বাণিজ্য, প্রাথমিক শিক্ষার বেহাল অবস্থা

প্রতি বছর বদলি বাণিজ্যের কারণে সিরাজগঞ্জ জেলার সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষার বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্কুলেই শিক্ষার সামান্যতম সুযোগ নেই।

বদলি বাণিজ্যের কারণে চর বা প্রত্যন্ত এলাকার অনেক স্কুলে একজন ও দুইজন করে শিক্ষক থাকায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার সকল উপজেলা সদরে ক্লাস রুমের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত শিক্ষক থাকায় অধিকাংশরা দিনভর বসে বসে অলস সময় পার করছেন।

বিষয়গুলো জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের গোচরে থাকলেও শিক্ষা কর্মকর্তারা কোনো ভূমিকা পালন করছেন না। ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার সামান্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলার সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, কামারখন্দ, চৌহালী, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি বছর বদলি বাণিজ্য নিয়ে সর্বত্র ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে।

উপজেলার শিক্ষা অফিসগুলোর এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারী বদলি বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তারা বদলির তদবিরের জন্য শিক্ষকদের প্রভাবিত করে মোটা অংকের টাকা আদায় করে থাকেন। প্রতি উপজেলায় প্রতি বছর ৪০/৫০জন করে শিক্ষক বদলি করা হয়। প্রতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নিয়মিতভাবে বদলি করা হয়।

আগামী বছর পুনরায় বদলি বাণিজ্য করার জন্য ইতোমধ্যে সকল উপজেলা শিক্ষা অফিসের এক শ্রেণি অসাধু কর্মচারী তৎপরতা শুরু করেছেন। এ জন্য শিক্ষকদের প্রভাবিত করে চর এবং প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলের শিক্ষকদের সুবিধাজনক স্থানে বদলি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবেদনগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলার প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের বদলির ব্যাপারে কোনো নিয়মনীতি মানা হয় না। সবকিছু চলছে ফি স্টাইলে। এ কারণে জেলার চরাঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকার অধিকাংশ স্কুলে রয়েছে একজন বা দুইজন করে শিক্ষক। ফলে এসব স্কুলে শিক্ষকের চরম সংকট শিক্ষার্থীদের শিক্ষার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

একজন বা দুইজন শিক্ষক নিয়ে ক্লাস করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা কিছুই শিখতে পারছে না। চাকরি রক্ষায় তারা দায়সারা গোছের কাজ করেন। পরীক্ষাও নেয়া হয় একইভাবে। কাগজে কলমে পাশ দেখানো হয়। আবার উপজেলা সদর বা যোগাযোগ সুবিধা এলাকার স্কুলগুলোতে ক্লাস রুমের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি শিক্ষক রয়েছে।

ফলে এসব স্কুলের অতিরিক্ত শিক্ষকরা দিনভর গালগল্প বা বসে বসে অলস সময় পার করেন। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছেন না। তারা প্রতি বছর বদলি বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থেকে শিক্ষার বেহাল অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

এ কারণে ২/৩ বছর আগে জেলার চর বা প্রত্যন্ত এলাকার যেসব স্কুলে ৩/৪ জন করে শিক্ষক ছিল। সেখানে এখন একজন বা দুইজন করে শিক্ষক রয়েছে। আবার উপজেলা সদর বা যোগাযোগ সুবিধা এলাকার যে সমস্ত স্কুলে আগে যেখানে ক্লাস রুমের চেয়ে ২/১ জন বেশি শিক্ষক ছিলেন এখন সেখানে দ্বিগুণের বেশি শিক্ষক রয়েছে। এ নিয়ে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। তারা সুরাহার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করেও ফলে পাচ্ছে না।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলা সদর, ৬টি পৌরসভাসহ এসব এলাকার যোগাযোগ সুবিধা অধিকাংশ প্রাথমিক স্কুলে ক্লাসরুমের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি শিক্ষক রয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল প্রাথমিক স্কুলে ক্লাস রুমে আছে ৪টি। সেখানে শিক্ষক আছেন ১০ জন। সিরাজগঞ্জ সদর পৌরসভার মোহাম্মদ আলী প্রাথমিক স্কুলে ক্লাস রুম আছে ৩টি। শিক্ষক আছেন ৭ জন। আবার সদর উপজেলার চরের মেছড়া সংযুক্ত প্রাথমিক স্কুল এবং মেছড়া হাটপাড়া প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষক আছেন মাত্র একজন করে।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দীক মোহাম্মদ ইউসুফ রেজা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, প্রতি বছর শিক্ষকদের বদলি করা হয়। এ জন্য উপজেলা পর্যায় কমিটি রয়েছে। তারা যেভাবে সুপারিশ করে সেভাবেই বদলি করা হয়। এই অবস্থার জন্য রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। তবে এ নিয়ে কোনো অনিয়ম বা বদলি বাণিজ্য হয় না।

তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জ শহরের অধিকাংশ স্কুলে ক্লাস রুমের চেয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক আছে। যেসব স্কুলে একজন বা দুইজন শিক্ষক আছে সেখানে অন্য শিক্ষক দেয়ার চেষ্টা করছি।

চরের স্কুলে একজন বা দুইজন শিক্ষক থাকার কথা স্বীকার করে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালেক বলেন, এসব স্কুলে আরও শিক্ষক দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। চাপের কারণে সফলতা মিলছে না।

এদিকে, সরকারি প্রাথমিক স্কুলে প্রতি বছর বদলির বর্তমান কার্যক্রম বন্ধের জন্য অভিজ্ঞ মহল ও শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যে সমস্ত স্কুলে মাত্রাতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছেন সেখান থেকে অতিরিক্ত শিক্ষকদের একজন বা দুইজন শিক্ষক আছেন এমন স্কুলে জরুরি ভিত্তিতে বদলি করে সব জায়গায় শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টিরও দাবি জানিয়েছেন।

ইউসুফ দেওয়ান রাজু/এএম/আইআই