দেশজুড়ে

৯ লাখ রোহিঙ্গাকে খাওয়ানো হবে কলেরা টিকা

নিজ দেশে পাশবিক নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের ৯ লাখ নাগরিককে কলেরা রোগের ভ্যাকসিন (টিকা) খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

টেকনাফ ও উখিয়ার ১ বছর থেকে সব বয়সী আশ্রিত মিয়ানমার নাগরিকরা কলেরার টিকা পাবেন। ১০ অক্টোবর থেকে এ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। নতুনদের সঙ্গে পূর্বে আসা মিয়ানমার নাগরিকরাও এ টিকার আওতায় আসবে।

তবে ১৫ বছর ও তার নিচের শিশু-কিশোরদের প্রত্যেককে দুই ডোজ এবং ১৫ ঊর্ধ্ব বয়সীদের এক ডোজ করে কলেরা প্রতিষেধক টিকা খাওয়ানো হবে। এ হিসাবে ৯ লাখ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (টিকা) প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার স্বাস্থ্য বিভাগ।

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এসব আশ্রিতদের ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (টিকা) খাওয়ানো কার্যক্রমে দেশি-বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলো সহযোগিতা করবে।

প্রাথমিকভাবে উখিয়া-টেকনাফের ৪ লাখ পরবর্তীতে আরও ৫ লাখ আশ্রিত নারী-পুরুষ এ কর্মসূচির আওতায় আসবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিমুক্ত রাখতে উখিয়া-টেকনাফের ৪ লাখ বাংলাদেশিকেও কলেরা রোগের টিকা খাওয়ানো হবে জানিয়েছেন কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম।

সিভিল সার্জন বলেন, আগামী ১০ অক্টোবর থেকে প্রাথমিকভাবে ৪ লাখ আশ্রিত মিয়ানমার নাগরিককে টিকা খাওয়ানো হবে। পর্যায়ক্রমে আরও ৫ লাখ আশ্রিত এ টিকার আওতায় আসবে। এছাড়া উখিয়া-টেকনাফকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ৪ লাখ বাংলাদেশিকেও কলেরা টিকা খাওয়ানো হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব ঝুঁকিপূর্ণ রোগ আমরা ইতোমধ্যে বিদায় দিতে সক্ষম হয়েছি, তার অনেকই আবার ফিরে আসছে মিয়ানমার থেকে আসা বাস্তুহারাদের মাধ্যমে। এটি বড় শঙ্কার বিষয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ রোগগুলো এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। ইতোমধ্যে অনেক আশ্রিত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে অনেকে। তাই আমরা কলেরার ভ্যাকসিন দেয়া শুরু করব শিগগিরই।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক সরকারি ২০টি এবং বেসরকারি ২৫টি মেডিকেল ক্যাম্প কাজ করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও মোবাইল টিমসহ সরকারিভাবে ৪০ জন ডাক্তার রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৪ হাজার ৩১৭ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ চিকিৎসা পেয়েছে।

এদিকে, শিশুদের মাঝে নানা সংক্রামক রোগ সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়।

ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানরত আশ্রিতদের হাম-রুবেলা, পোলিও এবং ভিটামিন-এ টিকা খাওয়ানো হয়েছে। উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ক্যাম্পে থাকা সব আশ্রিতরাই এ টিকা কার্যক্রমের আওতায় থাকবে।

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও রোগ প্রতিষেধক টিকা কার্যক্রমের সমন্বয়কারী ডা. মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, মিয়ানমার নাগরিকরা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে আসছে ঠিকই কিন্তু সেই সঙ্গে তারা নিয়ে আসছে মারাত্মক সব সংক্রামক রোগ। ইতোমধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে বিভিন্ন ক্যাম্পে। অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অপুষ্টিজনিত কারণে রোহিঙ্গারা সহজেই এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ জন্যই সরকারিভাবে রোহিঙ্গাদের কলেরা টিকা খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ডা. মিসবাহ উদ্দিন আগামী ১০ অক্টোবর থেকে এ কার্যক্রম শুরু করা হবে এমন আশা প্রকাশ করে বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ আশ্রিত শিশুকে দুই লাখ ৮০ হাজার ডোজ হাম-রুবেলা, পোলিও এবং ভিটামিন-এ প্রতিষেধক টিকা দেয়া হয়েছে। গত ৩ অক্টোবর থেকে ওই তিন ধরনের টিকা কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে। এখন শুরু হচ্ছে কলেরার টিকা কার্যক্রম। এ কার্যক্রমে ১৫ বছর পর্যন্ত শিশুরা দুই ডোজ এবং এর বেশি বয়সীরা একটি করে ডোজ পাবে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য বলছে, গত ২৫ আগস্টের পর পালিয়ে আসা প্রায় ৫ লক্ষাধিক জোরপূর্বক বাস্তুহারার মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি শিশু। খাদ্য, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো থেকে এরা বঞ্চিত। রাখাইনে নিজ এলাকায় ভীতিকর অভিজ্ঞতার নিয়ে আসা এই শিশুদের অনেকেই দিনের পর দিন দুর্গম পথে হেঁটে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক শিশু পুষ্টিহীনতার শিকার।

ডায়রিয়া, সর্দি-জ্বর ও চর্মরোগের সমস্যা নিয়ে প্রচুর রোহিঙ্গা হাসপাতালে যাচ্ছে। রোগীদের মধ্যে বড় একটি অংশ শিশু। টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় স্বাস্থ্য সেবা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন রোহিঙ্গা রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও দেশি-বিদেশি এনজিওর সহায়তায় সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা এই সেবা দিচ্ছেন। পুরো কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করছেন কক্সবাজারের সিভিল সার্জন।

সায়ীদ আলমগীর/এএম/জেআইএম