দেশজুড়ে

অন্যের ঠাণ্ডা নিবারণের যোদ্ধা ওরা

৭০ বছর বয়সী মরিয়ম বেগম স্বামী পরিত্যক্তা। তার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকেন। এখন মরিয়ম বেগম আশ্রয় নিয়েছেন মেয়ের বাড়িতে। ৫৫ বছর বয়সী ছামিতন বেগমও স্বামী পরিত্যক্তা। তার এক ছেলে। তিনি বিয়ে করে এখন ঢাকায় থাকেন।

তাদের মতো ৫৩ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগমও স্বামী পরিত্যক্তা। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। আনোয়ারা বেগম দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আর ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকেন। তারা সবাই কাঁথা সেলাই করে দিনাতিপাত করেন। তাদের মতো গাইবান্ধার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের আরও অনেক নারী শীতের কাঁথা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এখন গ্রামাঞ্চলগুলোতে চলছে শীতের কাঁথা সেলাই করার ধুম।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শান্তিরাম ইউনিয়নের পাঁচগাছী শান্তিরাম গ্রামের এই মানুষগুলো অন্যের জন্য কাঁথা সেলাই করলেও কখনও নিজের জন্য কাঁথা সেলাই করার সময় হয়ে ওঠে না। অনেক আগে তৈরি করা পুরোনো কাঁথা দিয়েই বছরের পর বছর শীত পার করছেন তারা। কখনও কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের কাছ থেকেও পাননি শীতের কম্বল।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধুবনী-বালারছিড়া সড়কের পাশ দিয়ে একটি মেঠোপথ চলে গেছে দক্ষিণের গ্রামগুলোতে যাওয়ার জন্য। সেই মেঠোপথ ধরে দুই কিলোমিটার গেলেই মরিয়ম, ছামিতন ও আনোয়ারা বেগমদের বাড়ি।

গত ১ নভেম্বর দুপুরে সরেজমিনে ওই গ্রামে ঢুকতেই দেখা যায়, রাস্তার পাশে, গাছের ছায়ায়, বাড়ির উঠোনে ও টংয়ে (বসার স্থান) বসে নারীরা কাঁথা সেলাই করছেন। তাদেরকে ঘিরে আশেপাশে বসে রয়েছেন শিশু ও অন্য নারীরা। তাদের মধ্যে চলছে নানান গল্পগুজব।

কাঁথা সেলাই করা এসব নারী ও গ্রামবাসী জানায়, শীত আসার কয়েকমাস আগে গ্রামাঞ্চলগুলোতে দুস্থ ও অসহায় নারীরা কাঁথা সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। এক মাসে দুই থেকে তিনটি কাঁথা সেলাই করা যায়। এরজন্য তারা কাঁথাপ্রতি পান পাঁচশত থেকে ছয়শত টাকা। আর বড় কাঁথা সেলাই করলে পান তেরশো থেকে পনেরোশো টাকা। একার সংসারে এ টাকাতেই কোনোমতে দিন কেটে যায় মরিয়ম, ছামিতন ও আনোয়ারা বেগমদের। এখন গ্রামগুলোতে ধুম পড়েছে শীতের কাঁথা তৈরি করার। প্রতিটি গ্রামেই দেখা মিলবে নতুন কাঁথা তৈরি করার দৃশ্য।

মরিয়ম বেগম বলেন, এখন অনেক বয়স হয়ে গেছে। ভারি কোনো কাজ করতে পারিনা। ঠিকমতো চোখেও দেখিনা। অনেকদিন থেকেই অন্যের কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করি। এতে যে টাকা পাই তা দিয়েই কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন কেটে যায় আমার। আমার মতো আরও অনেকেই এ শীতের কাঁথা তৈরি করে দিনযাপন করছে।

অন্যের বাড়িতে কাঁথা সেলাই করেন রুজিনা বেগমও (৩০)। তিনি বলেন, আমার স্বামী কৃষি কাজ করেন। তার সামান্য আয়ে চার সদস্যের সংসার ঠিকমতো চলে না। তাই একটু বাড়তি আয়ের জন্য অন্যের বাড়িতে গিয়ে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করি। এ টাকা সংসারের কাজে লাগছে।

নতুন কাঁথা সেলাই করার সময় দাদির পাশে বসে থাকা ওই গ্রামের কল্পনা আক্তার (৭) জানায়, আমরা গরিব মানুষ, আমাদের মতো আরও অনেকেরই কম্বল কেনার টাকা নাই। তাই দাদি কাঁথা সেলাই করে। তখন তার পাশে বসে কাঁথা সেলাই করা দেখি। এসময় দাদির কাছে নানান ধরনের গল্প শুনি। আমরা শীতের রাতে কাঁথা গায়ে দিয়ে শীত নিবারণ করি। এ কাঁথাই আমাদের শীতের কম্বল।

পাঁচগাছী শান্তিরাম গ্রামের কৃষক ছবিজল মিয়া (৫৫) বলেন, শীত আসলে টিভিত আর পেপারোত দেখি কম্বল দেয়া হয়। কিন্তু কোনোদিন হামরা একটা কম্বলও পাইলাম না। চরের মানুষের ম্যালা ট্যাকা, খালি তামরায় পায়। হামাক কেউ দেয়ন্যা।

রওশন আলম পাপুল/এমএএস/আইআই