ক্যাম্পাস

ইবির আয়ের ভার ভর্তিচ্ছুদের কাঁধে!

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধির ভার চেপেছে দুই হাজার ৪০০ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর কাঁধে। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে অনার্স ১ম বর্ষে ভর্তিতে গতবারের তুলনায় তিনগুণ ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আয় বাড়াতে বিগত বছরের তুলনায় ১৪টি খাত বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩৭টি। এতে আগের তুলনায় ভর্তিচ্ছুদের তিনগুণেরও বেশি ফি গুনতে হবে। এ বছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় হবে প্রায় ৩ কোটি টাকা।

সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ছাড়াই শুধু অর্থ কমিটির সভায় পাস করিয়ে তড়িঘড়ি করে বর্ধিত ফি কার্যকর করার সমালোচনাও করেছেন অনেক সিনিয়র শিক্ষক।

অর্থনীতি বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল মুইদ জাগো নিউজকে বলেন, ২৫% ভর্তি ফি বৃদ্ধি করলে সহনীয় পর্যায়ে থাকত। কিন্তু এখন ভতিচ্ছুদের জন্য বাড়তি চাপ হবে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন উর রশিদ আসকারী বলেন, ফি বৃদ্ধির আগে একটি ভর্তি ফি উন্নয়ন কমিটি করা হয়েছিল। তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ভর্তি ফি বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। সে অনুযায়ী ফিন্যান্স কমিটিতে এটি পাস হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আমাদের ভর্তি ফি এখনো অনেক কম এবং সহনীয় পর্যায়ে আছে। ভর্তি ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ন্যায় সঙ্গত।

উপাচার্য অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সঙ্গতির কথা বললেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত দেশ সেরা চার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি ৯ থেকে ১৩ হাজারের মধ্যে। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি ৪ হাজারের মধ্যে এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি ৭ হাজার ৫৬০ টাকা।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ জাগো নিউজকে বলেন, জনগণের টাকায় পরিচালিত হচ্ছে এসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আবার কেন দেশের গরীব মানুষের থেকে টাকা নিতে হবে? আর কুষ্টিয়ার ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রান্তিক জনপদে প্রতিষ্ঠিত। স্বভাবত সেখানে কম আয়ের লোকের সন্তানরাই উচ্চ শিক্ষার আশায় ভর্তি হয়। কিন্তু সেখানকার প্রশাসন এক লাফে তিনগুণ ভর্তি ফি বাড়ালে গরীব মানুষের উচ্চশিক্ষার আশাগুলোকে গলাটিপে হত্যা করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রমৈত্রীর আহ্বায়ক মোর্শেদ হাবিব বলেন,প্রান্তিক জনপদের এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভর্তি ফি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ঢাবির সুযোগ-সুবিধা কি এখানে দিতে পারবে? এখানে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের সন্তানরাই বেশি। আশঙ্কা প্রকাশ করছি এবার অনেকে চান্স পেয়েও ভর্তি হতে পারবে না। ভর্তি ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রমৈত্রীর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলেও তিনি জানান।

সূত্র মতে, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফিতে ২৩টি খাত ছিল। এ বছর নতুন ১৪টি খাত বাড়িয়ে ৩৭টি করা হয়েছে। আর প্রতিটি খাতেই ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গতবছর পর্যন্ত বিজ্ঞান অনুষদে এসব খাতে ফি লাগত ২ হাজার ১৭ টাকা। এ বছর তা ৬ হাজার ৯৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যান্য অনুষদে বিগত বছরে একই খাতে ফি লাগতো ১ হাজার ৯টাকা। এবার তা ৬ হাজার ৫০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া পরিবহন খাতে ৭৭০ টাকার স্থলে তিন গুন বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। বাৎসরিক হল ফি ৪০০ টাকার স্থলে হয়েছে ৯১৫ টাকা। এছড়া বিভাগভেদে ভর্তি ফি ১৫ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার স্থলে ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে প্রশাসন।

গত বছর বিজ্ঞান অনুষদের ভর্তি ফি ছিল সর্বসাকুল্যে পাঁচ হাজার ২৩৭ টাকা। এ বছর তা বৃদ্ধি করে ১৩ হাজার ৩১৫ টাকা করা হয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীদের বাড়তি ৮ হাজার ৭৮টাকা গুনতে হবে।

ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের বিভাগ গুলোতে ফি ছিল ৪ হাজার ৮৪৫ টাকা। ৭ হাজার ৫৭০ টাকা বৃদ্ধি করে এবার তা ১২ হাজার ৪১৫ টাকা করা হয়েছে।

এছাড়া ধর্মতত্ব, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান এবং আইন অনুষদের বিভাগগুলোতে ভর্তি হতে ফি লাগতো ৩ হাজার ৮২৯ টাকা। তবে এ বছর ৭ হাজার ৯৮৬ টাকা বাড়িয়ে ১১ হাজার ৮১৫ টাকা করা হয়েছে।

ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতোমধ্যেই মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রফ্রন্ট। এছড়াও মানববন্ধন করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বর্ধিত ফি না কমালে অবস্থান ধর্মঘটসহ কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

এইচ ইউনিটে ৭২তম মেধায় থাকা শাহরিয়ার সিফাত জাগো নিউজকে বলেন, আমার লেখাপড়ার খরচ আমিই জোগাড় করেছি এতদিন। চান্স পাওয়ার পরে মাত্র এক সপ্তাহ সময়ে এত টাকা কিভাবে জোগাড় করব ভেবে পাচ্ছি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেলিম তোহা বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিল রেখেই নতুন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের ফি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এখনও তলানিতে অবস্থান করছে বলে তিনি জানান।

ফেরদাউসুর রহমান সোহাগ/আরএআর/আইআই