অর্থনৈতিক জালিয়াতি ও অর্থ লেনদেন-সংক্রান্ত অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) আইন- ২০১৫ ধারায় মামলা সংখ্যা বাড়ছে। তবে মামলার তদন্তে দেখা দিয়েছে ধীরগতি। জনবল ও প্রয়োজনীয় ইন্সট্রুমেন্টের অভাবে যথাসময়ে ও কাঙ্ক্ষিত মানের তদন্ত হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলা আগে তদন্ত করত শুধু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুধু তদন্ত নয়, মামলা দেখাশোনাও করত দুদক। তবে ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুদুকসহ পাঁচটি সংস্থা মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায়।
দুদক ছাড়া অপর চারটি সংস্থা হলো- পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এ পাঁচ তদন্ত সংস্থা এখন তিন শতাধিক মানি লন্ডারিং মামলা তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
অবিযোগ উঠেছে, এর মধ্যে দুদকসহ চারটি প্রতিষ্ঠান তদন্ত শুরু করলেও মানি লন্ডারিংয়ের মামলার তদন্ত শুরুই করেনি মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
আইন অনুযায়ী মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত কিছু মামলা তদন্ত করার এখতিয়ার থাকলেও তদন্ত শুরুই করেনি মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এজন্য দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় ইক্যুইপমেন্ট না থাকাকে দায়ী করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন) সৈয়দ তৌফিক উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ঢাল-তলোয়ার ছাড়া যোদ্ধা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সে যুদ্ধে আসলে কিছু হয় না। আমাদের জনবল ঘাটতি রয়েছে, এটা সবারই জানা। এর মধ্যে দক্ষ জনবলের সংখ্যা আরো কম। জনবলকে নানা প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করার প্রক্রিয়াও বলা যায় নেই। যে কারণে আমরা সদিচ্ছা সত্ত্বেও মানিলন্ডারিং মামলার তদন্ত শুরু করতে পারিনি। তবে পাঁচ থেকে ছয়টি মামলায় সহযোগিতা করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, সংশোধিত আইনে দুদকসহ পাঁচটি সংস্থাকে মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ পাঁচ সংস্থা নিজ নিজ আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। তবে দুদুকও মামলা তদন্ত করছে। তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা অর্ধশতের বেশি।
সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন পাস হয়। ওই আইনে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে মামলা ও তদন্তের জন্য দুদককে একক ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আইনটি বাস্তবায়ন ও মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধ তদন্ত নিয়ে পুলিশসহ কয়েকটি সংস্থার পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়। যাছাই-বাছাই শেষে ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করে সরকার।
প্রকাশিত গেজেটে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ১২ ধারায় সংশোধনী আনা হয়। এ ধারার উপধারা-১-এ বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন (সরকার কর্তৃক বিধি দ্বারা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের), অনুমোদন ব্যতীরেকে কোনো আদালত এ আইনের অধীন কোনো অপরাধ বিচারার্থ আমলে গ্রহণ করবেন না।
সংশোধিত আইনে বলা হয়, ব্যক্তিপর্যায়ে প্রতারণা, আত্মসাৎ ও জালিয়াতির মামলা তদন্ত করবে পুলিশ। আর সরকারি সম্পত্তি-সংক্রান্ত প্রতারণা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যাংক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা তদন্ত করবে দুদক। দুদকের আইন হওয়ার আগে যেভাবে মামলা গ্রহণ ও তদন্ত করার এখতিয়ার ছিল, সেভাবেই এখন পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া বিচারাধীন মামলাও স্থানান্তর হবে বিশেষ আদালত থেকে বিচারিক হাকিমের আদালতে (জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট)।
সিআইডির অর্থনৈতিক অপরাধ তদন্ত ইউনিট সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থনৈতিক অপরাধের ২৬টি মামলা সিআইডির অর্থনৈতিক অপরাধ তদন্ত বিভাগের কাছে আসে। এর মধ্যে দুদকের হাত ঘুরে আসে ১৬টি মামলা, যদিও মামলাগুলো ২০১২ ও ২০১৩ সালে দায়ের হওয়া। আর অর্থনৈতিক অপরাধ-সংক্রান্ত বাকি ১০টি মামলা আসে দেশের বিভিন্ন থানা হয়ে। সম্প্রতি এ মামলার সংখ্যা বেড়েছে। শুধু সিআইডি প্রায় দেড়শ’ মামলার তদন্ত করছে। বেশকটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে।
সিআইডি জানায়, অর্থ বা সম্পত্তি পাচার, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেশের বাইরে অর্থ বা সম্পত্তি প্রেরণ বা রক্ষণ, দেশের বাইরের অর্থ বা সম্পত্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে তা না নিয়ে আসা, বিদেশে প্রকৃত পাওনা দেশে আনয়ন না করা, সন্দেহজনক লেনদেন কোনো অপরাধ হতে অর্জিত সম্পদ, কোনো সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন, দুর্নীতি ও ঘুষ, মুদ্রা জালকরণ, দলিল দস্তাবেজ জালকরণ, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, অবৈধ মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবসা, চোরাই ও অন্যান্য দ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা, অপহরণ, অবৈধভাবে আটকিয়ে পণবন্দি করা, খুন, নারী ও শিশু পাচার, চোরাকারবার, দেশি ও বিদেশি মুদ্রা পাচার, চুরি বা ডাকাতি বা দস্যুতা, মানব পাচার, যৌতুক, ভেজাল বা স্বত্ব লঙ্ঘন করে পণ্য উৎপাদন, যৌন নিপীড়ন, সংঘবদ্ধ অপরাধ, ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়সহ ২৪ ক্যাটাগরির অপরাধের মামলা তদন্ত করছে সিআইডি।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোল্যা নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) আইন ২০১৫ ধারার ২৭টির মধ্যে ২৪টি ধারায় পড়ে এমন অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। মামলার সংখ্যা বেড়েছে গেল কয়েক বছরে। ১৩৮টি মামলার তদন্ত চলছে।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সংশোধিত আইনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সে কর্তৃপক্ষ কারা হবে, সেটি সুস্পষ্ট করে আইনে উল্লেখ করা হয়নি। যে কারণে তদন্ত গতি হারাচ্ছে।
এ ব্যাপারে এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
জেইউ/জেডএ/এমএস