দেশজুড়ে

ওদের ঘরে ফেরা হয় না আর

এ পাড়ায় মধ্যরাতেই আলো জ্বলে বেশি। দূরের খদ্দেররা রাতবেলায় আসেন আর ভোরের আভা না ফুটতেই পল্লীর আঙিনা ত্যাগ করেন। যারা এক খদ্দের ঘরে নিয়েই রাত কাটান, তারাও আগ রাতেই ঘুম থেকে ওঠেন।

যৌনকর্মী ছন্দা ঘুম থেকে উঠেছে খানিক আগেই। গোসলের পর খাবার, এরপর চায়ের কাপে চুমুক দিতে সবে গেটে দাঁড়িয়েছে। এই ফাঁকে ইয়াবাও সেবন করেছে অষ্টাদশী ছন্দা।

চায়ের দোকানেই পরিচয়। চা শেষে জীবনকথা শুনতে ঘরে যাওয়া। চা স্টল ঘেঁষেই ছন্দার ঘর। সিলিংবিহীন টিনের চাল। দেয়াল পলেস্তার করা বটে, তবে চুনকাম করা হয়নি। রোজ তিনশ টাকা ভাড়া গুণতে হয় এই খুপড়িসম ঘরটির জন্য।

তবে বেশ পরিপাটি করা সাজানো কক্ষটি। ড্রেসিং টেবিলের ওপর থরে থরে কসমেটিকস রাখা। তার পাশে রাখা টেবিলের ওপর সাউন্ড বক্স। বক্সে পেন ড্রাইভ যুক্ত করে পুরনো দিনের বাংলা গান শুনছিল।

যেটুকু সময় গল্প হলো, সে সময়ে জীবন থেকে জীবন খানিক সরিয়ে রাখলো যেন। ছন্দা নাম রেখেছে যৌনপল্লীতে এসেই। মায়ের দেয়া নাম বলতে চাইলো না। ছয় বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে চতুর্থ। প্রাইমারি স্কুলের চৌকাঠ না পার হতেই জীবনের রং বদলে যায়। অভাবের সংসার। ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরেই গ্রামের পরিচিত একজনের হাত ধরে গার্মেন্টে চাকরি নিতে এসেছিলেন।

তা আর হয়নি। জীবন মিলে যায় দৌলতদিয়ার নিষিদ্ধ পল্লীতে। সেই যে ১৩ বছর বয়স থেকে গতর খাঁটছেন, আজও বিরাম মেলেনি। শুরুতে দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। সরদারের কারণে সম্ভব হয়নি। এখন পল্লীর পরিচিত নাম ছন্দা। মিষ্টি হাসি ঠোঁটে ধরেই রাখে। চোখ মায়ায় ভরা। শরীরের গঠন সুডৌল ছিল বটে, তবে নেশার বাণে ভেঙেপড়া প্রায়।

বাড়ি যশোর বলেই থেমে গেলো। গ্রাম-ঠিকানা আর বললো না। পল্লীতে আসার দু’বছর পর মুক্তি মিলেছিল। তবে ফেরা হয়নি স্বাভাবিক জীবনে। চোরাপথে পা রেখে আলোর দেখা মিললেও চোখ বুঝে ফের পাড়ি জমায় দৌলতদিয়ার অন্ধকার গলিতে। পরিবারের লোকেরা জানে, গার্মেন্টেই চাকরি করে ছন্দা। এখন বছরে দু’একবার বাড়ি যাওয়া হয়। তবে নেশাগ্রস্ত জীবন নিয়ে দু’দিনের বেশি থাকা হয় না গ্রামে।

বিয়ে, সংসার, প্রেম নিয়ে কথা উঠতেই চোখ ছলছল করে উঠলো। কথাও আর সরছিল না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘আমার ঘরে রোজ-ই প্রেমিক আসে। হাজারও প্রেমিকের দেখা পেলাম গেল ৫ বছরে। কিন্তু প্রেম তো পেলাম না।’

‘বাড়ি গিয়ে আবারও কেন ফেরা’ জবাবে বলেন, সবই তো চলে গেছে। জীবনের স্বাদ এখন তিঁতে। বিয়ে, সংসার করতে হলে মিথ্যার জাল বুনতে হবে। তার চেয়ে এই ভালো আছি। অন্তত খাওয়া-পরার খোটা শুনতে হচ্ছে না।

গল্পের মাঝেই দাঁড়িয়ে ড্রেসিং টেবিল থেকে একটি আই লাইনার (কাজল দেওয়ার কাঠি) হাতে নিয়ে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেন। ক্ষণেই একটি মায়া ভরা চোখ আঁকলেন। চোখের নিচে কয়েকটি অশ্রু ফোটাও এঁকে দিলেন। সে ফোটায় যেন গোটা দেওয়াল ভিজে গেলো। অশ্রু গড়ালো ছন্দার সত্যি চোখেও। আর বললো, ‘এ চোখ-ই আমার জীবনগল্প’।

এএসএস/এমআরএম/আরআইপি