সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনে বার বার যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিচ্ছে আন্তঃনগর রেলগুলোতে। এতে আতঙ্কিত হচ্ছেন যাত্রীরা। প্রশ্ন উঠেছে এই সেকশনে চলাচলকারী রেলের মান নিয়ে। রেলের যান্ত্রিক দুর্ঘটনা এই রেলপথে নিত্ত-নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ এই সেকশনের রেলগুলো পুরাতন ও জরার্জীণ। রেলওয়ের তথ্য মতে আাখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তীকা, পাহাড়ীকা, উদয়ন, উপবন ও কালনী এক্সপ্রেস নামের ৬টি আন্তঃনগর ট্রেন প্রতিদিন গড়ে ১২ বার চলাচল করে। এসব যাত্রায় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশন নিয়ে সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম পথে ভ্রমণ করেন। রেল পথে যারা ভ্রমণ করেন তাদের বেশির ভাগ রেলকে বেছে নেন নিরাপদ যাত্রার মাধ্যম হিসেবে। কিন্তু বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিঘ্ন ঘটছে নিরাপদ রেল যাত্রার। নিয়মিত চলাচল করেন এমন যাত্রীরা আছেন নিরাপত্তা শঙ্কায়। সাম্প্রতিককালে কয়েকবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উল্লেখযোগ্য হারে এই সেকশনে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে রেল চলাচল বারবার থমকে দাঁড়িয়েছে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে নিয়মিত রেল পথে যাতায়াত করেন মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম টুটুল। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নিরাপদ যাত্রার আশায় সড়ক পথকে বাদ দিয়ে নানা ঝামেলার পর একটা রেলের টিকেট সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে মনে হচ্ছে রেল পথেও নিরাপদ নয়। তিনি জরাজীর্ণ রেল কোচ এবং ইঞ্জিন পরিবর্তনের দাবি জানান।
সাম্প্রতিকালের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনায় যান্ত্রিক দুর্ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে এই পথে চলাচলকারী যাত্রীদের মধ্যে। যার কারণে কমতে পারে রেলের যাত্রীর সংখ্যাও।
জানা যায়, চলতি মাসের ৭ তারিখ একদিনে দুইবার দেখা দেয় যান্ত্রিক ত্রুটি, কুলাউড়ার মাইজগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে পারাবত এক্সপ্রেসের বগি ও ইঞ্জিনের সংযুক্তস্থলের বাফার রিং ভেঙে গেলে বগির সঙ্গে ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে ২ ঘণ্টা আটকে থাকে পারাবত।
সেই দিন রাতে আবার ঢাকাগামী আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুলাউড়া স্টেশনের পরবর্তী লংলা স্টেশন অতিক্রমকালে ট্রেনের বগি(গ-প্রথম শ্রেণি)-ও চাকার সংযুক্ত একটি রড ভেঙে যায়। এ অবস্থায় ভাঙা রডটিসহ টেনে ট্রেনটি টিলাগাঁও, মনু স্টেশন অতিক্রম করে রাত ১২টায় শমশেরনগর স্টেশনে এসে যাত্রা বিরতি করে। এর মাঝে মনু রেল সেতুসহ অনেকগুলো সেতু অতিক্রমকালে বগির ঝুলে থাকা রডের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেও পারত। পরে উপবন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বগিটি কেটে শমসেরনগর স্টেশনের ২নং লাইনে রেখে বাকি যাত্রীবাহী বগি নিয়ে রাত ২টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। অল্পের জন্য বেঁচে যান হাজার হাজার যাত্রী। সেই রাতে উপবনে করে ঢাকা যাচ্ছিলেন কুলাউড়া পৌরসভার কাউন্সিলর মন্জুরুল আলম খোকন। তিনি জাগো নিউজকে জানান, হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি শুরু হয় এতে ভীতি ছড়িয়ে পরে যাত্রীদের মধ্যে। আল্লাহ সহায় থাকায় মারাত্মক কিছুর হাত থেকে বেঁচে গেছি।এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও এলাকায় সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেসের ১১টি বগি নিয়ে লাইনচ্যুত হয়। এতে সিলেট-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে প্রায় ১৫ ঘণ্টা। অর্থ প্রতিমন্ত্রীসহ ট্রেনের হাজারও যাত্রী সামান্যের জন্য মারাত্মক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যান।
গত ২৩ জানুয়ারি ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি এলাকায় ইঞ্জিনের দুর্বলতার কারণে ভোর রাতে দু’দফা আটকা পড়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর বিকল্প ইঞ্জিন আসলে ট্রেনটি সচল হয়। এতে পাহাড়ি এলাকায় যাত্রীরা চরম ভীতি ও দুর্ভোগের শিকার হন।
গত বছরের ১২ নভেম্বর সিলেট ও মোগলাবাজার রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে পারাবত এক্সপ্রেসের বগি থেকে ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে চলে যায়।
এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক মুঠোফোনে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, জরাজীর্ণ রেল বলা যায় না, কারণ যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা স্বাভাবিক ব্যাপার। মানবদেহে যেমন মাঝে মাঝে সমস্যা হয় রেলেও হতে পারে। নতুন রেল কোচ, ইঞ্জিন আনার প্রক্রিয়া চলছে। স্বাভাবিক নিয়মে নুতুন কোচ, ইঞ্জিন আসলে পুরাতনগুলো বদল করা হবে।
রিপর দে/এমএএস/পিআর