বিদেশে টাকা দিয়ে প্রতারিত হন সোহাগ উদ্দিন রানা (২৮)। পরে দেশে ফিরে ৭৫ হাজার টাকায় পিস্তল কিনে অপরাধ জগতে পা বাড়ান। সর্বশেষ গত বুধবার কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় একটি ছাত্রাবাসে অস্ত্রের মুখে কলেজছাত্র সাগর ও সজিবকে জিম্মি করেন। পরে টাকা না পেয়ে সাগরকে হত্যা করে পালিয়ে যান।
শনিবার বিকেলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুমী আক্তারের আদালতে গ্রেফতার রানা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
জেলা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহ কামাল আকন্দ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে এসআই শাহ কামাল আকন্দের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘাতক রানাকে শনিবার ভোর রাতে ঢাকার কমলাপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার রানা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাতাবাড়িয়া গ্রামের সেলিম জাহাঙ্গীরের ছেলে।
শনিবার দুপুর ১২টার দিকে কুমিল্লা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন জানান, বেশ কয়েক মাস আগে সোহাগ উদ্দিন রানা স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে একটি পেট্রল পাম্পে চাকরি নেন। সেখানে তিনি অবৈধ হয়ে পড়লে পুলিশ তাকে আটক করে। এতে তিনি দেড়মাস জেল খাটেন। পরে তিনি জেল থেকে বের হয়ে মালয়েশিয়ায় থাকাবস্থায় সাউথ আফ্রিকা যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি একজন দালাল ধরেন এবং বাবার মাধ্যমে নিজ এলাকার চারজনকে মালয়েশিয়া নেয়ার কথা বলে প্রতারণার আশ্রয়ে ৮ লাখ টাকা নেন। ওই টাকা থেকে রানা সাউথ আফ্রিকা যাওয়ার নামে ৬ লাখ টাকা দালালকে দিয়ে প্রতারিত হন।
এদিকে এলাকার ওই চারজনকে মালয়েশিয়া পাঠাতে না পারায় রানার বাবা চাপে পড়ে জমি বিক্রি করে তাদের টাকা পরিশোধ করেন। এরই মধ্যে রানা তার বাবা-মায়ের অজান্তে দেশে ফিরে আসলেও বাড়ি না গিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি অপরাধ জগতে পা বাড়ান এবং একজনের নিকট থেকে ৭৫ হাজার টাকায় ৭.৬৫ বোরের একটি পিস্তল কিনেন।
যেভাবে চলে কিলিং মিশন
ঘটনার ২/৩ দিন আগে রানা ও নাসির নামে তার এক বন্ধু কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স এলাকার বিএইচ ভূঁইয়া হাউজ নামের তিনতলা ভবনের নিচতলার মেসে থাকা ছাত্রদের জিম্মি করে টাকা আদায়ের ফন্দি আঁটে। ২ এপ্রিল তারা ওই মেসে গিয়ে ভাড়া থাকার কথা বলেন। এতে ছাত্ররা সম্মত হলে রানা মেসের ছাত্র সজিবের কাছে ভাড়া বাবদ অগ্রিম এক হাজার টাকা দেন। পরদিন রাতে রানা ও নাসির ওই মেসে ওঠেন এবং মেসের ছাত্র সাগর ও সজিবকে বিভিন্ন কৌশলে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেন। পরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের বাবার নিকট থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন। সারারাত নির্যাতন করেও টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ভয়ে রানা ও নাসির দুই ছাত্রকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। রানা পিস্তল দিয়ে সজিবের বুকে গুলি করেন। এ সময় পিস্তলে গুলি আটকে গেলে ধারালো ছুরি দিয়ে সাগরকে গলা কেটে হত্যা করে তারা পালিয়ে যান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, ছুরি ও রশি উদ্ধার করে।
কুমিল্লা পুলিশ সুপারের দিক নির্দেশনায় ঘাতকদের গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিবির এসআই শাহ কামাল আকন্দ ও এসআই সহিদুল ইসলাম।
এসআই শাহ কামাল আকন্দ জানান, রানার সঙ্গে ৩ বছর আগে থেকে এক মেয়ের সম্পর্ক চলে আসছিল। ঘটনাস্থলে ঘাতক রানার ফেলে যাওয়া মোবাইল ফোনের সূত্রে ধরে ওই মেয়েকে ডিবি হেফাজতে আনা হয়। একপর্যায়ে ওই মেয়ের মোবাইল ফোনে রানা কল করলে মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে ঢাকার কমলাপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। অপর ঘাতককে ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। এ ঘটনায় কোতয়ালী মডেল থানায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা হয়েছে। বিকেলে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার পর ঘাতক রানাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাখাওয়াত হোসেন ও তানভীর সালেহীন ইমন, ডিবির পরিদর্শক নাছির উদ্দিন মৃধা, কোতয়ালী মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ আবু ছালাম মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কামাল উদ্দিন/আরএআর/জেআইএম