দেশজুড়ে

বিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে উৎকোচ নিলেন আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা

বাল্যবিবাহ বন্ধে সরকার আইন প্রণয়নসহ সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছে। বাল্যবিবাহ বন্ধে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাদেরও বিশাল দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে ভূত তারাবে কে?

যে সরকারি কর্মকর্তা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করবে সেই কর্মকর্তাই যদি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গিয়ে উৎকোচ গ্রহণ করে তবে সরকারের এই মহতি উদ্যোগ কীভাবে সফল হবে। এ ধরনেরই একটি ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মেগচামী ইউনিয়নে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মেগচামী ইউনিয়নের রশিদ ফকিরের মেয়ে রওশনা খাতুনের সঙ্গে একই উপজেলার বাগাট ইউনিয়নের পূর্বপাড়া গ্রামের মো. কাইয়ুমের ছেলে তমালের বিয়ের দিন ধার্য্য ছিল গত ১৩ মে রোববার। বিয়ের দিন যথারীতি বরযাত্রী কন্যা পক্ষের বাড়িতে এসে বিয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি খাওয়া দাওয়া চলছিল। খবর পেয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হন মধুখালী আনসার ভিডিপির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুন নবি। তিনি বাল্যবিয়ে হচ্ছে এমন অভিযোগ এনে কন্যা ও বর পক্ষকে বিয়ে বন্ধ করার নির্দেশ দেন।

পরে তিনি উভয়পক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এ সময় কন্যা পক্ষ বাল্যবিবাহ হচ্ছে না মর্মে এফিডেভিটের কাগজসহ অন্যান্য কাগজপত্র ভিপিডি কর্মকর্তাকে দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরে আলাপ আলোচনার ভিত্তিত্বে আনসার ভিপিডি কর্মকর্তা উভয়পক্ষকে জানান ৩০ হাজার টাকা দিলে এ বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে।

আশ্বাস পেয়ে কনে ও বর পক্ষের অভিভাবকরা দরাদরি করে উৎকোচের পরিমাণ ১৭ হাজার টাকায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হন। আনসার ভিডিপি কর্মকর্তাকে উৎকোচের ১৭ হাজার টাকা দেয়া হলে তিনি মুহূর্তেই পাল্টে যান। টাকা গ্রহণ করে তিনি কনের দাদি আলেয়া বেগম ও ফুপু পলসি এবং বর তমালকে আটক করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে যান।

পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা মনোয়ারের উপস্থিতিতে কনের বাবা রশিদ ফকির ও বর তমালের বাবা কাইয়ুম শেখ মুচলেকা দিয়ে বর তমাল ও আটকদের ছাড়িয়ে আনেন।

এদিকে এ ঘটনার পরদিন সোমবার সকালে কনের বাাব রশিদ ফকির মধুখালী আনসার ভিডিপির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুন নবির বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ এনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি অভিযোগপত্র দায়ের করেন।

কনের চাচা কামরুল ইসলাম বলেন, ওই দিন রাতে আটকদের ছাড়িয়ে আনতে আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাই। সেখানে মুচলেকা দিয়ে আটকদের ছাড়িয়ে আনি।

তিনি আরও বলেন, আনসার ভিডিপির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুন নবিকে যে উৎকোচের টাকা দিয়েছি সে কথা তখন ভয়ে বলতে পারিনি। পরদিন সোমবার সকালে আমার ভাই রশিদ ফকির উৎকোচ নেয়ার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অবহিত করেন।

মধুখালী উপজেলার মেগচামী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাসান আলী খান বলেন, ওই দিন মেগচামীতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা এসেছিলেন আমি শুনেছি। তবে সেখানে কোনো উৎকোচ গ্রহণের ঘটনা ঘটেছে কি-না সেটা আমার জানা নেই।

এ ব্যাপারে মধুখালী উপজেলা আনসার ভিডিপির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নুরুন নবি বলেন, বাল্যবিবাহ হচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে ওই বিয়ে বাড়িতে যাই। পরে ঘটনার সত্যতা পেয়ে আমি বর তমালসহ কনের দাদি ও ফুপুকে আটক করে নিয়ে আসি। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান তারা। উৎকোচ নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কোনো উৎকোচ গ্রহণ করিনি। বাল্যবিবাহ দিতে না পেরে তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।

এ ব্যাপারে মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তফা মনোয়ার জানান, আনসার ভিডিপি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উৎকোচ নেয়ার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমএএস/এমএস