হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী শ্মশান দখল নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে ব্যানার নিয়ে রাজনীতি করেছেন বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক। সেই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে নিজের মতো করে দায়সারা গোছের ব্যানার ছেপে নিজের দোষ ঢাকতে চেয়েছেন তিনি।
আদালতের নির্দেশ আমান্য করে মনগড়াভাবে নিজের মতো করে ব্যানারে কয়েকটি বাক্য লিখে নতুন করে শিবগঞ্জের বানাইল মহাশ্মাশানে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এ নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা।
দ্বিতীয় বারের মতো শুক্রবার বিকেলে বানাইল মহাশ্মশানে গিয়ে হাতে গোনা কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সেই আলোচিত ব্যানারটি টাঙিয়ে দেন আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক।
এবার তিনি ব্যানারে লিখেছেন, ‘শিবগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং বানাইল মহাশ্মশান কমিটির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে জায়গা নিয়ে বিরোধ মীমাংসিত হয়।’
এর আগের ব্যানারে তিনি লিখেছিলেন, ‘বানাইল মহাশ্মশানের সভাপতি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আর কোনো বিরোধ নেই। আমরা একে অপরের সহযোগিতার ভিত্তিতে সহঅবস্থান করবো এবং শান্তিময় পরিবেশের অঙ্গীকারবদ্ধ।’
দ্বিতীয় দফায় ব্যানার টাঙানো শেষে সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৫-৭ জনকে ডেকে এনে ফটোসেশন করেন তিনি। তবে ওই ব্যানারে আদালতের নির্দেশিত বাক্য লেখা হয়নি।
আদালত ব্যানারে তাকে লিখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘শ্মশানের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ চেষ্টা করে আমি ভুল করেছি। এ ধরনের কাজ আর কোনো দিন করব না।’
দ্বিতীয় দফায় ব্যানার লিখে টাঙিলে দিলেও আদালতের নির্দেশিত কথাগুলো না লিখে তাতে মনগড়া কয়েকটি বাক্য লিখে নিজের দোষ ঢাকতে চেয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা। ব্যানার টাঙানোর সময় শতবর্ষী বানাইল মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ কেউ উপস্থিত ছিলেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল থেকেই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হকের অনুসারীরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন নেতাদের ফোন করে এবং সশরীরে গিয়ে জানান, গত ২৩ মে (বুধবার) বিকেলে আজিজুল হক যে ক্ষমা চেয়েছেন সেই বিষয়টি যথাযথ হয়নি। এ জন্য তিনি আবার শুক্রবার বিকেল ৪টায় নতুন করে ক্ষমা চাইবেন এবং ব্যানার টাঙাবেন। আপনারা সবাই উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু তার এ কথায় কেউ সাড়া দেয়নি।
শুক্রবার আজিজুল হকের অনুসারী সেলুনকর্মী শাহ আলম ওই লেখা সংযুক্ত ব্যানারটি শ্মশানে টাঙিয়ে দেয়। পরে ৫-৭ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে ডেকে ব্যবসায়ী সন্তোষ কুমার সাহার হাত ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন আজিজুল।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- শিবগঞ্জ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দুলাল অধিকারি, ব্যবসায়ী রাজকুমার গুপ্ত, বিজয় প্রসাদ কানু, পরিমল চন্দ্র মোহন্ত, মুক্তিযোদ্ধা দীলিপ কুমার মোহন্ত কানু, শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি লুৎফর রহমান, স্থানীয় সুধি সিরাজুল ইসলাম ও শিবগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তৈলাঙ্গ মোদক প্রমুখ।
শিবগঞ্জ উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র অধিকারি বলেন, বিকেলে ঘুম থেকে ওঠার পর বাড়ির বাইরে দাঁড়ালে সভাপতি ও তার লোকজন কোনো কিছু বোঝার আগেই আমাকে সেখানে ধরে নিয়ে যায়। তবে ব্যানারে যা লেখা হয়েছে তা আদালত নির্দেশিত নয়। আদালত বলেছেন এক কথা তিনি লিখেছেন অন্য কথা। ব্যানার নিয়েও রাজনীতি শুরু করেছেন তিনি।
শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক দ্বিতীয় দফায় ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গে বলেন, গত বুধবার (২৩ মে) ক্ষমা চাওয়ার জন্য যে ব্যানার লেখা হয়েছিল সেখানে শুধু সভাপতি লেখা ছিল, তাই এবার আওয়ামী লীগ সভাপতি লেখা হয়েছে। এছাড়া ব্যানারটি স্থায়ীভাবে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।
হাইকোর্ট যা লিখতে বলেছিলেন তা লেখা হয়নি কেন জানতে চাইলে আজিজুল হক বলেন, ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি এক রকম লিখলেই হলো।
শতবর্ষী বানাইল বারোয়ারি শিবমন্দির এবং শ্মশান সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটির সভাপতি শ্রীকৃষ্ণ মোহন্ত জানান, শেষ সময়ে আমাকে বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু কমিটি ছাড়া এককভাবে আমার কোনো কিছু করার ছিল না। তাই আমি ক্ষমা অনুষ্ঠানে যাইনি।
শিবগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রাম নারায়ণ কানু বলেন, দ্বিতীয় দফায় ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি।
উল্লেখ্য, শ্মশান দখল করা নিয়ে ২০১৬ সালের ২৬ জুন জাগো নিউজে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন যুক্ত করে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) একটি রিট করে।
এ রিট আবেদনে ওই বছরের ৩১ জুলাই হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বিষয়টি তদন্ত করতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন।
এ নির্দেশে জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ অবস্থায় ২০১৬ সালে জারি করা রুলের ওপর শুনানি শুরু হয়েছে হাইকোর্টে।
এ রুলের ওপর শুনানির সময় গত ১৩ মে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতিকে তলব করেন বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ।
গত ২০ মে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে গেলে আদালত বলেন, স্থানীয় জনগণের কাছে ওই অপকর্মের জন্য শ্মশানে ব্যানার লাগিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। একই সঙ্গে আগামীকাল রোববার দখল চেষ্টা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে আদালতে লিখিতভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে বিষয়টি আদালত ফয়সালা করবেন।
লিমন বাসার/এএম/আরআইপি