এক সময় ফরিদপুরের প্রাণের উৎস ছিল কুমার নদ। ফরিদপুর শহরের টেপাখোলার অনতিদূরে মদনখালীতে পদ্মা নদী থেকে কুমার নদের উৎপত্তি হয়ে শহর অতিক্রম করে নগরকান্দা ও ভাঙ্গা উপজেলার মধ্য দিয়ে মাদারীপুরের বিলরুটে কুমার নদের যাত্রা শেষ হয়।
এই নদ ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও আশে পাশের এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের একটি প্রধান উৎস ছিল। এছাড়া এ নদ শস্য উৎপাদন পানি নিষ্কাশনসহ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতেও ব্যাপক ভূমিকা পালন করতো। এক কথায় এ নদ ছিল ফরিদপুরসহ গোপালগঞ্জ পর্যন্ত এলাকার মানুষের রুটিরূজির অন্যতম মাধ্যম। কালের পরিক্রমায় পলি পড়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ নদ কার্যত প্রায় মৃত হয়ে পড়ে।
১৯৬০ সালের পর এই প্রথম ফরিদপুরের কুমার নদের পুনঃখনন কাজ শুরু হয়েছে। স্বাধীনতার পর ফরিদপুর অঞ্চলে গৃহীত বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। খননের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে দেখা দিয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, মৎস্য চাষ এবং নৌ চলাচলের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষে এ নদ পুনঃখননের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
২০১৬ সালের নভেম্বরে একনেক এ প্রকল্প অনুমোদন করে। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি এ প্রকল্পের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি চুক্তি সম্পাদিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ প্রকল্পের আওতায় ২৫০ কোটি ৮১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমার নদ ও আশপাশের খাল পুনঃখনন কাজ বাস্তবায়ন করছে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে এ খনন কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হবে। বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে প্রাণচাঞ্চল্য পুনরায় ফিরে আসবে।
সরেজমিনে ফরিদপুর সদরের চুনাঘাটা ও অম্বিকাপুর এলাকায় নদে খনন কাজ দেখতে গেলে চোখে পড়ে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১৫টি এক্সকোভেটর দিয়ে নদের তল দেশ থেকে মাটি তোলার কাজ করছে।
স্থানীয় গৃহবধূ কল্পনা বেগম, রাবেয়া আক্তার, কলিম ব্যাপারী জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে এই নদে শুষ্ক মৌসুমে কোনো পানি থাকে না। বাচ্চারা বিকেলে নদে খেলাধুলা করে। তারা জানান, এখন যেহেতু সরকার কুমার খনন শুরু করেছে-তাহলে পানি পাব। তাদের দাবি নদ খননের কাজটি যেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ জানান, প্রকল্পের আওতায় নদী খনন ও রেগুলেটর নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে কমপক্ষে ছয় ফুট গভীরতায় পানি প্রবাহ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত পানি সমস্যার সমাধান হবে।
তিনি বলেন, কুমার নদে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩০ কিলোমিটার খনন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়েছে গত ২১ এপ্রিল। ফরিদপুর অঞ্চলের ছয়টি উপজেলার উপর দিয়ে সর্পিল আকারে বয়ে যাওয়া এই কুমার বিস্তীর্ণ এই জনপদের জীবন-জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
ফরিদপুর সদর আসনের এমপি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দিনদিন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সারাদেশে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। এই কারণেই সরকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দিয়ে নদ-নদী খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে ফরিদপুর অঞ্চলের কুমার নদের খননের কাজ শুরু করা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, নদের তীরবর্তী বসবাসকারী নারীরা যেন তাদের ঘর-গৃহস্থালি কাজসহ গোসল করতে পারে সেজন্য ৬১টি পাকা ঘাট নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও ফরিদপুর শহরতলীর হারোকান্দিতে একটি বড় পরিসরে শ্মশান ঘাট নির্মাণ করা হবে।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, ফরিদপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল কুমার নদ খনন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর চেষ্টায় অবশেষে এ জেলার মানুষ তাদের কাঙ্খিত আশা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের অন্য জেলাগুলোর মতো ফরিদপুরের পানির লেভেল নিচে নেমে গেছে। এই কারণে সঠিক সময়ে এই নদ খনন কাজ শুরু হয়েছে। এই খনন কাজ শেষ হলে জেলার জীবনমানের অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটবে।
এমএএস/আরআইপি