দেশজুড়ে

প্রতি বলে বাজি ধরার নেশায় নিঃস্ব হচ্ছে তরুণরা

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় এক ভয়ঙ্কর জুয়ার নেশায় মেতে উঠেছে তরুণ সমাজ। নতুন এ জুয়ার নাম হচ্ছে ‘চিকন-মোটা’। নাম শুনে মনে হতে পারে এ আবার কেমন নেশা? সেবন ই বা করে কীভাবে? নতুন মনে হলেও মাদকের মতোই ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে এ নেশাটি।

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার তরুণ সমাজ সব থেকে বেশি আক্রান্ত এ নেশায়। এ কারণে নৈতিক অবক্ষয়সহ এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এ মরণ নেশা থেকে তরুণদের রেহাই দিতে প্রয়োজন অভিভাবক ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগ ও জনগণের সার্বিক অংশগ্রহণ। বিভিন্ন দেশে খেলা নিয়ে জুয়া খেলার কথা কারও অজানা থাকার কথা নয়। সেই জুয়ার রেশ এখন চলে এসেছে বাংলার গ্রামগঞ্জ আর মাঠে ঘাটে।

চরভদ্রাসনে ক্রিকেট জুয়াড়িরা ‘চিকন মোটা’ সাংকেতিক নাম ব্যবহার করছে। এ নিয়ে উপজেলার বিভিন্নস্থানে চলছে এ চিকন-মোটার জুয়া খেলা। এরই মধ্যে এ জুয়া খেলায় অনেকে হেরে নিঃস্ব হয়েছেন। উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন বাজারের দোকানে গেলে দেখা যায় অনেকেই খুব উৎসুক হয়ে ক্রিকেট খেলা দেখছেন। কিন্তু এর মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে চিকন মোটার দল। সাধারণত জুয়াড়িরা পাঁচশ টাকা থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত ধরছে বাজি। এ খেলায় বিশ্বাস মূলধন।

বিশ্বস্ত লোকের কাছে বাজির টাকা জমা দেয়া হয়। মুঠোফোনের মাধ্যমে তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন এ খেলা। বিনিময়ে তিনি কমিশন পান। এ খেলায় ক্রিকেটের দুর্বল দলটিকে চিকন ও শক্তিশালী দলটি মোটা সাংকেতিক নাম ব্যবহার করা হয়। এমন কি প্রতি বলে ছয়/চার/কত রান হবে, উইকেট পরবে, ওয়াইড, নো বল হবে কিনা এ নিয়েও চলে বাজি। অবশ্য এ বাজি খেলা চলা অবস্থাতেই শুধু ধরা হয়ে থাকে।

এ সর্বনাশা জুয়া খেলায় চরভদ্রাসনের জেলে, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে যারা বয়সে তরুণ তারা জড়িয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়নের জাকেরের সূরা স্লুইচ গেট সংলগ্ন মাঠে কয়েকজন তরুণকে ক্রিকেট খেলতে দেখা যায়। এ সময় তাদের কাছ থেকে জানা গেছে, ৬শ টাকা বাজিতে চার ওভারের খেলা খেলছে তারা। এরকম দৃশ্য চরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বলে জানায় একাধিক সূত্র। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, গত এক মাসে উপজেলার মাথাভাঙ্গা, চরসুলতানপুর, কানাইরটেক, জাকেরের সূরা, চরভদ্রাসন কলেজ মাঠ, চরহাজিগঞ্জ বাজার, চরভদ্রাসন বাজারসহ বিভিন্নস্থানে এ খেলা চলছে। আপাত দৃষ্টিতে ক্রিকেট খেলছে, টিভিতে খেলা দেখছে মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে বেশির ভাগ কিশোর ও তরুণ এ নেশায় আক্রান্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেশায় আক্রান্ত চরভদ্রাসন সদর বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ছোট ব্যবসা করি আমি। এ খেলার নেশায় পরে নিঃস্ব হয়ে গেছি। একদিন এক হাজার টাকা জিতে লোভে আবার খেলতে ইচ্ছা করে। লাভের চেয়ে লোকসানই হয় বেশি। তবে বড় বড় অঙ্কের বাজিও ধরে ধনীর। এমনকি বিদেশ থেকে বিকাশের মাধমে টাকা পাঠিয়ে বাজি ধরা হয়। তবে তিনি জানান, আমি আর এখন খেলি না। তার দাবি, এ খেলা আর বন্ধ করাও সম্ভব হবে না।

গাজীরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ইয়াকুব আলী বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি। বিভিন্ন ইউপি সদস্যদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলেছি। শিগগিরই অভিভাবকদের নিয়ে বসব। তাদের সচেতন করতে আমরা কাজ করবো।

চরভদ্রাসন থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাম প্রসাদ ভক্ত বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেয়া কঠিন। তবুও আমরা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছি।

চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুন নাহার বলেন, গত আইনশৃঙ্খলা সভায় ক্রিকেট জুয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। গ্রাম পুলিশদের বিষয়টি পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছি। সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমএএস/পিআর