দেশজুড়ে

কোয়েলই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে

নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস, ইচ্ছা, ধৈর্য আর চেষ্টা থাকলে অনেকভাবেই আয় করা যায়। এমনই এক দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেছেন চুন্নু নামের এক যুবক। কোয়েল পাখির খামার দিয়ে তা বিক্রি করে তিনি এলাকার বেকারদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছেন। নিজে হয়েছেন স্বাবলম্বী। চুন্নুর দেখাদেখি ফরিদপুরের বেকার যুবকরা দিন দিন কোয়েল ও টার্কি মুরগি পালনের দিকে ঝুঁকছে। বাজারে বেশ চাহিদা থাকায় এবং দামও ভালো পাওয়ায় অনেক বেকার যুবক এখন টার্কি-কোয়েল পালন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

ফরিদপুর সদর উপজেলার মাচ্চর ইউনিয়নের ঘনশ্যামপুর গ্রামের আব্দুল মালেক মিয়ার ছেলে চুন্নু মিয়া গত কয়েক বছর আগে ১৬ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে কোয়েল পালন শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তার পুঁজি ২৩ লাখ টাকা। তিনি কোয়েলের পাশাপাশি টার্কি ও তিতির পালন করছেন।

অভাবের সংসারে চুন্নু মিয়া পড়াশোনা বেশিদূর এগোতে পারেনি। তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তখন থেকেই তাকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। এ কারণে আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি।

পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে পঞ্চম চুন্নু। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। চুন্নু তার নিজের ১৬ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করে কোয়েল পালন। খলিলপুর বাজারের কাছে ২০ শতাংশ জমি বাৎসরিক ১০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে একটি শেড নির্মাণ করে কোয়েলের খামার করেন তিনি। এ খামারটি শুরু করতে সব মিলিয়ে তার ব্যয় হয়েছিল ৫৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে নিজের ১৬ হাজার টাকা বাদে বাকি টাকার জোগান দিয়েছিল তার এক আত্মীয়।

খলিলপুর বাজার সংলগ্ন ‘ফ্রেন্ড কোয়েল হ্যাচারি টার্কি ও তিতির ফার্ম’-এ গিয়ে কথা হয় চুন্নুর সঙ্গে। চুন্নু জানায়, প্রথমে নওগাঁ থেকে ৩৩৫টি কোয়েল এনে শুরু করেন খামার। প্রতিটি কোয়েলের দাম পড়েছিল ১০ টাকা করে, পরিবহন খরচসহ মূল্য পড়েছিল ১২ টাকা। তিনি জানান, প্রতিটি কোয়েল বছরে ৩ শটি ডিম দেয়। ডিম দেয়া বন্ধ করে দিলে প্রতিটি কয়েল ৩০/৩৫ টাকা দরে বিক্রি করে দেন। তবে ডিম তিনি বিক্রি করেন না। বাচ্চা ফুটিয়ে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন জেলার অন্তত ২৫ জন খামারিদের কাছে সরবরাহ করে থাকেন।

চুন্নু ইনকুইবেটরের মাধ্যমে ডিম থেকে কোয়েলের বাচ্চা ফুটিয়ে প্রতিমাসে গড়ে ৩০ হাজার কোয়েল বিক্রি করেন বিভিন্ন খামারিদের কাছে। এই ইনকিউবেটরটি দুই বছর আগে কিনেছেন তিনি। কোয়েল দিয়ে খামার শুরুর কিছুদিন পর লেয়ার মুরগি পালন শুরু করেন চুন্নু। কিন্তু তাতে তিনি সুবিধা করতে পারেননি। তবে এখন কোয়েলের পাশাপাশি টার্কি ও তিতির পালন করছেন। ইন্টারনেট ঘেটে টার্কি ও তিতিরের লালন পালন বিষয়ে ধারণা নিয়ে এ ব্যাপারে উৎসাহি হন তিনি।

তিনি জানান, তিতির ও টার্কি বিক্রি হয় ওজন হিসেবে। তিতির সাধারণত সৌখিন ব্যক্তিবর্গ বাড়ির শোভা বাড়াতে পালন করার জন্য সংগ্রহ করে থাকেন। প্রতি কেজি তিতির নয়শ টাকা দরে বিক্রি হয়। আর খাবারের মাংস হিসেবেই টার্কি বিক্রি হয়। এ মাংস মুরগির মাংসের চেয়ে শক্ত এবং কোলেস্টরেল মুক্ত, খেতেও ভালো। টার্কির মাংস বিক্রি হয় ৮শ টাকা কেজি দরে। একটি টার্কিতে আট, দশ থেকে শুরু করে ১৮ কেজি পর্যন্ত মাংস হয়। কোয়েলের ডিম থেকে বাচ্চা হতে সময় লাগে ১৮ দিন। অপরদিকে টার্কি ও তিতিরের ডিম ফুটে বাচ্চা হতে সময় নেয় ২৮ দিন।

চুন্নু অভিযোগ করে বলেন, জেলার পশু হাসপাতালে গিয়ে তেমন একটা সহযোগিতা পাওয়া যায়না। অনেক সময় কাউকেই পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, পশু হাসপাতালের সহযোগিতা পেলে আরও লাভবান হতে পারতাম।

‘আমার রুটি রুজি কোয়েলের মাধ্যমে হয়েছে’-মন্তব্য করে চুন্নু বলেন, অভাবের কারণে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারিনি। তাই চাকরি বাকরির বিফল চেষ্টা না করে সরাসরি নেমে গেছি কোয়েল পালনে। হয়ে উঠেছি একজন খামারি। কোয়েলই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সঙ্গে দিয়েছে আর্থিক স্বচ্ছলতা আর পরিচিতি।

ফরিদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুল হক বলেন, জেলার তরুণ ও যুবকরা কোয়েল চাষে উৎসাহিত হচ্ছে এটি একটি ভালো দিক। কোয়েল চাষ খুবই লাভজনক মন্তব্য করে তিনি বলেন, এরা খাবার কম খায়, রোগ বালাই হয় না বললেই চলে। পশু হাসপাতালে গিয়ে ভোগান্তির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাবিবুল হক বলেন, আমাদের জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা আমরা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফরিদপুরে কতজন কোয়েল খামারি রয়েছেন জানতে চাইলে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের হাতে এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ পরিসংখ্যান নেই। তবে আমরা তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছি, কিছুদিনের মধ্যে এ সংখ্যা জানাতে পারবো। তবে দিন দিন এর সংখ্যা বেড়েই চলছে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, বর্তমান সরকার বেকার যুবকদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং দিয়ে আসছে। জেলাতে যুব উন্নয়ন, মৎস্য বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ, বিসিকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া আছে বেকার ও শিক্ষিত যুব সমাজকে ট্রেনিংসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে গড়ে তোলার। এ কারণে ফরিদপুরের অনেক বেকার যুবকরাই এখন গাভি পালন, কোয়েল কিংবা টার্কি মুরগি পালনের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এতে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

এমএএস/এমএস