দেশজুড়ে

বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অর্ধশতাধিক পরিবার

পদ্মা নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরমানাইর ও চরনাছিরপুর ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক পরিবার। ওই পরিবারগুলোর সদস্যরা এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে।

গত দুই বছরে আড়িয়াল খাঁ নদের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে প্রায় ১০টি গ্রাম। বর্ষা শুরু হতে না হতেই ভাঙনের মুখে পড়েছে হতদরিদ্র চরাঞ্চলের মানুষ। নদে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গত কয়েকদিন যাবত ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে দিন দিন গৃহহীনের সংখ্যা বাড়ায় বর্তমানে দিশেহারা ওই অঞ্চলের খেটে খাওয়া পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ পাড়ের মানুষগুলো।

চরনাছিরপুর ইউনিয়নের শিমুলতুলী বাজারের অংশ, হালিম হাওলাদার কান্দি, খলিফা কান্দি, ছোটকোলপাড়, ছোটকোল, জামাল শিকদারের কান্দি, ইব্রাহীম মুন্সীর কান্দি, চেরাগ আলী হাজীর কান্দি, চেরাগ আলী মুন্সীর কান্দি, বাদশা কান্দি, মোল্যা কান্দি, কাজী কান্দি, করিম মোল্যার কান্দি ও চর মানাইর ইউনিয়নের গিয়াস উদ্দিন ফকির কান্দি, গিয়াস উদ্দিন বেপারী কান্দি, হাজারী হাজীর কান্দিসহ আরও বেশকিছু গ্রামের বেশির ভাগ অংশই বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামগুলোর বাসিন্দারা ভাঙন আতঙ্কে দিন পার করছে।

ভাঙনে ওই গ্রামগুলোর প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো গৃহহীন হয়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। বাড়িঘর, গবাদিপশু, গাছপালা ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় নানা সংকট দেখা দিয়েছে পরিবার গুলোর মাঝে। অনেক পরিবার তড়িঘড়ি করে তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদের বুকে ভাসছে মৃত গবাদি পশু ও বসতঘরের কিছু অংশ। এছাড়াও নদের পানিতে ভাসছে চরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের শেষ সহায় সম্বল লেপ-বালিশ।

গত কয়েকদিনে চরনাছিরপুর ইউনিয়নের হালিম হাওলাদার কান্দি গ্রামের নয়া বাড়ি মসজিদ ও হাওলাদার বাড়ি মসজিদ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তোতা মাতুব্বর, কাদের মাতুব্বর, দেলোয়ার মাতুব্বর, সহিদ শেখ, জাহাঙ্গীর শেখসহ আর বেশকিছু পরিবারের বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, হঠাৎ নদী ভাঙনের মুখে কোনো মতে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি। বসতভিটাসহ বসতি সবই নদীতে চলে গেছে। মাঝরাত থেকে হঠাৎ বড় বড় চাপ পড়ছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছি। এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক একর ফসলি ও বসতভিটার জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ১৬ হাজার লোকের বসবাস ইউনিয়নটিতে।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বানু বেগম (৪২), পিয়ারা খাতুন (৩৮) ও নাদিরা বেগম (৪৬) জানান, ‘কি আর কমু ভাই আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে রাক্ষুসে নদী। সবই চলে গেছে। এখন কি করবো জানি না। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুবই কষ্ট করে দিন চলছে।’

স্থানীয় সামসুদ্দীন মাতুব্বর বলেন, হঠাৎ করে ভাঙনে কয়েকটি ঘর নদীতে চলে গেছে। ফসলি জমিও নদী গর্ভে। ভাঙন থামছে না। কোথায় যাবো কী করবো ভেবে পাচ্ছি না।

ভাঙন হুমকির মুখে রয়েছে চরমানাইর ইউনিয়নের চর বন্দর খোলা ফাজিল মাদরাসা, চর বন্দর খোলা নাদেরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থানীয় মসজিদ ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন কেন্দ্র। অপরদিকে জমাদ্দার বাড়ি মসজিদ, বেপারী বাড়ি মসজিদ, দক্ষিণ চরডুবাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ভাঙন হুমকির মুখে রয়েছে।

চরনাছিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আক্কাচ আলী বলেন, এই ইউনিয়নটি পদ্মা নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদ বেষ্টিত। বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়তে হয় ইউনিয়নের হতদরিদ্র মানুষদের। এ বছর বর্ষার শুরুতেই আড়িয়াল খাঁ নদের পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। দিনরাত সকলের খোঁজখবর রাখছি। নদের ভাঙন কবলিতদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

চরমানাইর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আইয়ুব আলী জানান, চরম হুমকির মুখে রয়েছে ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম। সঙ্গে রয়েছে মাদরাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে এলাকাবাসী। এ পর্যন্ত ইউনিয়নের প্রায় ৬০ একর ফসলি জমি নদী গর্ভে চলে গেছে।

সদরপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আবু এহসান মিয়া জানান, নদের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকার কাজ চলছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আশ্রায়ন প্রকল্পে পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) কামরুন্নাহার জানান, ভাঙনের বিষয়টি শুনেছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরএআর/এমএস