গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ডেগেরচালা এলাকায় নিট অ্যান্ড নিটেক্স লিমিটেড নামে একটি পোশাক কারখানায় বকেয়া বেতনের দাবিতে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসময় পানি পান করে কয়েকজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে ওই কারখানায় ফের শ্রমিক বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে শ্রমিকরা।
রোববার সকাল ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত টানা মহাসড়কের উপর টায়ার জ্বালিয়ে এবং বাস ট্রাক এলোপাতাড়িভাবে রেখে অবরোধ সৃষ্টি করে শ্রমিকরা। এসময় হাজার হাজার যাত্রী চরম বিপাকে পড়ে।
শ্রমিক, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ডেগেরচালা এলাকায় নিট অ্যান্ড নিটেক্স লিমিটেড নামের ওই কারখানাটি গত ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন প্রদান করে কারখানা ঈদের ছুটি দেয়। ছুটির পর এক মাস পার হয়ে গেলেও শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছিলেন না। এ দিকে ভবনের মালিকেরও কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ৭-৮ মাসের ভাড়া পাওনা রয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ তার ভাড়াও পরিশোধ করছিলেন না।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, কারখানার পার্টনারদের মধ্যে একজন মো. হাবিবউল্লাহ কিছুদিন আগে মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকার স্ত্রী কারখানা চালাতে অস্বীকার করেন। এতে কারখাটি আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। ব্যাংক থেকেও তারা টাকা পাচ্ছিলেন না। এ দিকে প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিকের বেতন ও ভবন মালিকের ভাড়া দেয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অপর দিকে ভবন মালিক কারখানাটি অন্যত্র ভাড়া দেয়ার জন্য শনিবার ভবনের সামনে ভাড়ার নোটিশ টানিয়ে দেন। শ্রমিকরা ভবন ভাড়ার নোটিশ দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তারা তাদের বেতন ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
শনিবার বিকেলে মালিক, শ্রমিক, পুলিশ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্তক্রমে কারখানার মেশিন বিক্রি করে প্রথমে কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই দিন বিকেলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের এক পর্যায়ে সন্ধ্যায় কিছু শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে কারখানার বিষাক্ত পানি পান করে শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ এবং ২০-২৫ জন শ্রমিক মারা গেছে। এতে শ্রমিকরা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানায় ভাঙচুর চালাতে চেষ্টা করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি এবং টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ দিকে শনিবার সন্ধ্যায় অসুস্থ ৪০ জন শ্রমিককে স্থানীয় তায়রুন্নেছা হাসপাতালে এবং ১০-১৫ জনকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। এদের মধ্যে প্রায় সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
শ্রমিক মৃত্যুর গুজবে রোববার সকাল থেকে শ্রমিকরা কারখানার ফটকে এসে ভিড় করতে থাকে। এসময় তারা বিক্ষোভ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গিয়ে অবস্থান নেয় এবং মহাসড়কটি অবরোধ করে রাখে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে বোর্ড বাজার থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত সড়কের আশপাশের সকল কারখানা থেকে শ্রমিকদের জোরপূর্বক বের করে নিয়ে আসে তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য। কয়েকটি কারখানা থেকে শ্রমিকরা বের হতে না চাইলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ম্যাট্রেক্স সোয়েটার, মিম সোয়েটার, আরএস নিটসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ও জোরপূর্বক ভেতরে গিয়ে ভাঙচুর করে।
প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে শ্রমিকরা এসব তাণ্ডব চালালেও শিল্প পুলিশ বিক্ষোভকারীদের দমাতে পারেনি। বিকেল পৌনে ২টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ, কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে। এতে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে ওই মহাসড়কে বেলা সোয়া দুইটার দিকে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাছা থানা পুলিশের ওসি কাজী ইসমাইল হোসেন জানান, ঈদের আগে আগস্ট মাসের অর্ধেক বেতন দেয়া হয়। বাকি অর্ধেক বেতন ১২ সেপ্টেম্বর দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু কারখানার আর্থিক অনটনের কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের বেতন ওই সময়ে দিতে পারেনি। শনিবারও শ্রমিকরা তাদের ওই বকেয়া টাকার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তারা শনিবার রাত ১০টার দিকেও একই মহাসড়কে অবস্থান নেয় এবং বিক্ষোভ শুরু করে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু একই দাবিতে রোববার সকালে নিটেক্স কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও নিজেদের কারখানাসহ আশেপাশের কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুর শুরু করে এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করে রাখে।
কারখানার নিটিং অপারেটর খাদিজা বেগম জানান, আমাদের বেতন না দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ কারখানা বন্ধের পাঁয়তারা করছিলেন। শ্রমিকদের যাতে বেতন না দিতে হয় এজন্য কৌশলে তারা ট্যাংকির পানির সঙ্গে কিছু মিশিয়ে রাখে এবং ওই পানি খেয়ে বেশ কিছু শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আমিনুল ইসলাম/এমএএস/আরআইপি