মতামত

ডাকসু নির্বাচন : যে বার্তা দিলেন শিক্ষার্থীরা

গত ১১ মার্চ (সোমবার) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয় দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে। প্রহরের হিসাবে ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয় ১২ মার্চ। ডাকসু সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ফল ঘোষণা করেন। তিনি যখন নির্বাচনের ফল ঘোষণা শুরু করেন, তখন তার সামনে যারা সমবেত, তাদের সবাই একটি প্যানেলের ‘প্রকাশ্য’ সমর্থক।

কেউ কেউ শুভাকাঙ্ক্ষী। সমবেতদের মধ্যে ভোটার শ্রেণির যারা, তারা স্বভাবতই নিজের পছন্দ মতো ফল প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা ভঙ্গ করে যখন ডাকসুর উপাচার্য ঘোষণা করলেন যে, ‘সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন নুরুল হক নুর’, তখন সমবেতদের মধ্য থেকে ধ্বনি ওঠে ‘মানি না, মানি না; এ ফল মানি না।’ আরও আশ্চর্যের যে, কেউ কেউ চিৎকার করে এটাও বলছিলেন, ‘প্রহসনের নির্বাচন, মানি না।’

তাদের আগে এই শেষের স্লোগানটি প্রায় সারাদিন তুলেছিলেন বিরোধী পক্ষের নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা। তুমুল হইচইয়ের মধ্যেই উপাচার্য ফল ঘোষণা শেষ করেন। এরপর সহকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিবেষ্টিত হয়ে সিনেট ভবন থেকে প্রশাসনিক ভবনে নিজের দফতরের সামনে আসেন পেছন গেট দিয়ে। এরপর প্রশাসনিক ভবনের উপাচার্য দফতর সংলগ্ন গেট দিয়ে তিনি পরিবেষ্টিত অবস্থায় গাড়িতে বাসভবনে চলে যান। তখন রাত ৪টা পেরিয়ে গেছে।

দুই.এবারও ডাকসুর সঙ্গে ১৮টি হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নানা ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্যে সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হয়। এ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৪৩ হাজার ২৫৬। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭৫০ শিক্ষার্থী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে বলে রিটানিং কর্মকর্তার দফতরের দেয়া হিসাব বলছে। সেই হিসাবে মোট ভোট পড়েছে ৫৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।

ডাকসুতে মোট পদ ২৫টি। এর মধ্যে ছাত্রলীগ জয় পেয়েছে জিএস ও এজিএসসহ ২৩টিতে। প্রধান পদ ভিপি দখল করে নিয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। ডাকসুতে ৯টি সম্পাদক পদের মধ্যে একটিতে (সমাজসেবা) জয় ছিনিয়ে নিয়েছে এই সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।

অন্যদিকে ১৮টি হল সংসদের মধ্যে ১২ হলে ভিপি ও ১৪ হলে জিএস পদে জয় পেয়েছে ছাত্রলীগ। বাকি ৬টি হলের মধ্যে দুটিতে ভিপি পদে এবং একটিতে কোটা আন্দোলনকারী নেতারা জয়লাভ করেন। অপর দুটি হলের ভিপি পদে স্বতন্ত্র ও দুটিতে ছাত্রলীগের বিদ্রোহীরা জয়লাভ করেন। জিএস পদে একটি কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা, দু’টি হল স্বতন্ত্র ও একটিতে ছাত্রলীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডাকসু ও হল সংসদে ছাত্রলীগের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা হয়েছে এই সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের।

তিন.ডাকসুর নির্বাচন ছিল সর্বাধিক অংশগ্রহণমূলক। নির্বাচনে অংশ নেয় ১৩টি প্যানেল। মোট ভিপি ২১ প্রার্থী ছিলেন, জিএস ১৪ জন। ভিপি পদে আটজন এবং জিএস পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। ২৫টি পদের জন্য বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্রসহ প্রার্থী ২২৯ জন ছিলেন। অন্যদিকে প্রত্যেক হল সংসদে ১৩টি পদে নির্বাচন হয়। হল সংসদে (১৮টি হলে ২৩৪ পদে) প্রার্থী ছিলেন ৫০৯ জন। প্রার্থীর এই বিশাল সংখ্যার কারণে ডাকসুতে তিনটি এ-ফোর আকারের ওএমআর ফরমের ব্যালট করতে হয়েছে। প্রত্যেক হলে অবশ্য একটি ব্যালটেই সংকুলান হয়েছে। হল সংসদ ও ডাকসু মিলিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে গড়ে ৩৮টি করে ভোট দিতে হয়েছে।

অংশগ্রহণমূলক হলেও এ নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে তা বলার অবকাশ রাখে। তবে সেটা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়। শুধু এ টুকুই বলা যায়, কেউ যদি বিষয়টি উপলব্ধি করতে চান তাহলে তিনি বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনার দিকে তাকাতে পারেন।

একটি বিষয় শুধু উল্লেখ করে যেতে চাই। তা হচ্ছে, ডাকসুর এই ভোটগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২ হাজার শিক্ষক আছেন। তাদের সবাই যেমন এই ভোটগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন না। তেমনি যারা ভোটগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন তাদের সবাই অস্বচ্ছতার পক্ষে ছিলেন না। আবার ভোটের ফল ১১ মার্চ রাত ১১টার মধ্যেই হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু কেন সেই ফল রাত সাড়ে ৩টার দিকে প্রকাশ করা হলো, সেই কারণও অনুসন্ধানের বিষয়। ইতিমধ্যে ডাকসুর সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম গোটা ডাকসু নির্বাচন প্রক্রিয়া তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠনের দাবি তুলেছেন (১২ মার্চের যুগান্তর)। ওই দাবি যথার্থই বলা যায়। তবে এখানে আলোচ্য বিষয় ভিন্ন।

চার.ডাকসুতে যে ১৩টি প্যানেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সেগুলোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য ছাত্র সংগঠনের প্যানেল ছিল। প্রধান দুই ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল ছিল। ছিল দেশের সবচেয়ে পুরনো ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন বাম সংগঠনের মোর্চার প্যানেল। জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রীসহ সরকারপন্থী বাম সংগঠনগুলোর পৃথক মোর্চার প্যানেলও ছিল। পৃথকভাবে ছাত্র ফেডারেশনের একজন জিএস প্রার্থী ছিল। সেই হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল প্রায় আড়াই ডজন ছাত্র সংগঠনই এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এছাড়া সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পৃথক দুটি প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনে অংশ নেয়। এগুলো হচ্ছে স্বতন্ত্র জোট এবং স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ।

এত সব প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন এই নির্বাচনে অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাত্রলীগের সঙ্গে অরাজনৈতিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সঙ্গে হয়েছে। চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই পরিষদের সৃষ্টি হয়।

ডাকসুর ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৫ পদের মধ্যে মাত্র একটিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রার্থী কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসেন। এ পদে ছাত্রদলের প্রার্থী ছিলেন কানেতা ইয়া লাম-লাম। বাকি ২৪টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ছাত্রলীগ বনাম কোটা সংস্কারের নেতাদের মধ্যে। শুধু ডাকসু নয়, ১৮টি হল সংসদেও ছাত্রলীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থীদের মধ্যে।

পাঁচ.গত ২০ বছরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা ইস্যু আসে। এরমধ্যে কোটা সংস্কারের দাবিটা এই ২০বছর ধরেই জিইয়ে আছে। এই শতকের শুরুতে যখন প্রথম দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীরা মাঠে নামে, তখন সেটা ছিল ছোট্ট পরিসর। হলে হলে কিছু ছাত্রছাত্রীরা দাবি নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করে। ক্যাম্পাসেও মিছিল বেরিয়েছিল। ২০০৩-২০০৪ সালের দিকের আন্দোলন নির্মম নিপীড়নের শিকার হয়। তখন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এই দাবির ব্যাপারে ছিলেন প্রায় নীরব।

কোটা ব্যবস্থায় যেহেতু ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ও আছে, তাই এটির কারণে গোটা কোটাব্যবস্থা সম্পর্কে কথা বলাটা ছিল স্পর্শকাতর বিষয়। বিপরীত দিকে, ক্যাম্পাসে বিরোধী সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও আদর্শিক অবস্থান থেকে ছাত্রলীগ ওই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এমনকি আন্দোলনকারীদের দমনে সবধরনের পন্থা বেছে তারা। তখন ছাত্রদল ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে না দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত ও নীরব ছিল। তখন অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মনের ভাষা বুঝতে পারেনি। ‘কোটা সংস্কারের দাবি ইসলামী ছাত্র শিবিরের’- এই ভ্রান্ত ও অবাস্তবমুখি ধারণার বশবর্তী হয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে দূরে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রসংগঠনগুলোর ব্যাপারে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মনে ক্ষোভ আর অসন্তোষ মনের ভেতরে পুঞ্জিভূত হতে থাকে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মত।

বিগত দু’দশকে ওই ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি যখনই লাভা উদ্গিরণের সুযোগ পেয়েছে, তখনই সময়ক্ষেপণ করেনি। ২০০৪ সালে ৪ বছরের অনার্স ডিগ্রিকে প্রফেশনাল ডিগ্রির মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা পুঞ্জিভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটায়। তখন অবশ্য সরকারবিরোধী ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম ছাত্রসংগঠনগুলো ভুল করেনি। সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে নেমে যায় মাঠে।

ফলে দু’দিনের আন্দোলনেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফসল ঘরে তুলে নেয়। সরকার চারবছরের অনার্স ডিগ্রিকে প্রফেশনাল ডিগ্রি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। ফলে প্রথম শ্রেণির সব চাকরিতে ওই ডিগ্রি ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে গ্রহণের ঘোষণা দেয়। ২০০৭ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে নতুন পরিস্থিতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা জাতীয় রাজনীতি কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। তখন কিন্তু সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ছাত্রসংগঠনগুলোর পাশে দাঁড়াতে ভুল করেনি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে ভূমিকা রাখে।

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের নিয়মিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসে। নতুন সরকারের পথচলা শুরুর পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিষয় ফের উপেক্ষিত হতে থাকে। গত ১০বছরে ছাত্রদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট নানা ইস্যু এসেছে। এরমধ্যে শিক্ষায় ভ্যাট আরোপ, নিরাপদ সড়ক এবং কোটা সংস্কার আন্দোলন অন্যতম। এসব আন্দোলনে ছাত্রলীগকে পাশে পায়নি সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিপরীত অবস্থানে পেয়েছে।

ছাত্রদলের ভূমিকাও কাঙ্খিত ছিল না। বাম সংগঠনগুলো দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি সরকারপন্থী আরেকটি বিরোধী অবস্থানে আছে। স্বাভাবিক কারণেই সরকারের নীতিবিরোধী ভূমিকায় যেতে পারে নি সরকারপন্থী বাম ছাত্রসংগঠনগুলো। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী অংশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কোটার ইস্যুতে পাশে না পাওয়ায় সেই সমর্থন কোনো তাৎপর্য আনেনি।

বরং ওই সুযোগে হোক আর নেতৃত্বের শূন্যতা থেকে হোক, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কিছু যুবক বেরিয়ে আসেন। তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনে সামনে থেকে সাধারণ শিক্ষাথীদের নেতৃত্ব দেন। নানা রক্তচক্ষু আর হুমকি-ধমকি, মামলা, নির্যাতন, হুলিয়ার মুখেও ওই যুবকরা মাঠ ছাড়েননি। চালিয়ে গেছেন আন্দোলন। শুধু তাই নয়, কেউ কেউ কারাবরণ আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রিমান্ডের মুখোমুখিও হয়েছেন।

ফলে ছাত্রছাত্রীদের দাবির জন্য এসব নেতাই যখন ভোটের দাবি নিয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়েছেন তখন তারা তাদের ফেরাননি। যে কারণে একটি পুরানো, ঐতিহ্যবাহী এবং ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের সুসংগঠিত কর্মীবাহিনীর সঙ্গে ডাকসু ও হল সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মেও নেতারা শক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয় ছিনিয়ে আনে। নির্বাচন নিয়ে যেসব অভিযোগ আসছে, সেসব না থাকলে ফল আরও তাজ্জব করা হতে পারতো- এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে ‘হলজীবন’। ১৯৯০ সালের পর এই বাস্তবতা শুরু হয়, যখন থেকে ডাকসুর খিড়কিও বন্ধ হয়ে যায়। যখন যেই দল ক্ষমতায় আসে, তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে-হলে কায়েম করে দখলদারিত্ব। পরোক্ষভাবে আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ থাকে তাদের হাতে। সিটবণ্টন কার্যত চলে যায় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের হাতে।

হলের টিভিরুম, গেমসরুম, রিডিং রুম, ডাইনিং সর্বত্র তাদের কর্তৃত্ব। স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ নেই। জরুরি ক্লাস আছে না পরীক্ষা- সেটা বিবেচনার প্রয়োজন নেই। মিছিল আছে তো ক্লাস-পরীক্ষা ফেলে মিছিলে যেতে হবে। এভাবে আবাসিক হলগুলোতে নানা উৎপাত চলছে সেই ৯০ সালে গণতান্ত্রিক আমল শুরুর পর। একদিকে সিটের প্রয়োজন, আরেকদিকে হলে নিরাপদভাবে বসবাসের জন্য মুখ বুঝে সব সহ্য করতে হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের।

ছয়.সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই। প্রত্যেক ডাকসুর মেয়াদ একবছর। সেই হিসেবে ১৯৯১ সালের জুলাইতে এর মেয়াদ শেষ হয়। এরমধ্যে এরশাদ সরকারের পতনের পর তৎকালীন ডাকসু ভিপি-জিএস-এজিএস জাতীয় রাজনীতিতে নাম লেখান। ফলে সেই ডাকসু আর কার্যকর থাকার কথা নয়। অপরদিকে ষাট, সত্তর ও আশির দশকে স্বৈরাচার সরকারগুলোর আমলে যেখানে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন হয়েছে, সেখানে গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ডাকসুর খিড়কি বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভোটের জন্য ধর্ণা ধরার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে দিনে দিনে একশ্রেণির ছাত্রনেতা ও উচ্ছিষ্টভোগী হলে হলে নির্যাতকের ভূমিকায় আবির্ভূত হন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনৈতিক স্বাধীনতায় তারা হস্তক্ষেপ করেন। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি দিনে দিনে বীতশ্রদ্ধা তৈরি হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ে ২০০০ সাল থেকে ২০০৮ সালের মে পর্যন্ত সাংবাদিকতা করেছি। কাছ থেকে দেখেছি উল্লিখিত দৃশ্যাবলী। পাশাপাশি তাদের বুকে কান পেতে শুনেছি বোবা কান্নার শব্দ। ব্যথা ও কষ্টের কথা শুনেছি দিবানিশি। কিন্তু এতদিন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ ছিল না। ডাকসু নির্বাচন এনে দেয় সেই সুযোগ। ফলে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রসংগঠনগুলো ভোটের হিসাবে উপেক্ষিত হয়। প্রতিযোগিতায় চলে আসে অখ্যাত ও অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।’

সাত.ডাকসু নির্বাচনের এই ফল অনেক বার্তা দিয়ে গেছে। ছাত্রছাত্রীরা চায় স্বাধীন ক্যাম্পাসজীবন। চাপিয়ে দিয়ে নয়, মন জয় করে তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে। ক্যাম্পাস জীবনে এবং পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতির জন্য তাদের মৌলিক কিছু চাহিদা আছে। সেগুলো আদায়ে আন্দোলনের প্রয়োজন হলে সেই আন্দোলনে যে বা যারা নেতৃত্ব দেবে, তারাই তাদের (শিক্ষার্থী) চোখের মণি। খবরদারি করে মুখ বন্ধ রাখা যাবে, কিন্তু সুযোগ পেলে রায় হবে ভিন্ন।

ছাত্রসংগঠনগুলোর গতানুগতিক রাজনীতি ছাত্রদের কাছে আর যুৎসই নয়। এই নির্বাচন সেই বার্তাই দিলো। আরও বার্তা দিলো, ছাত্রসংগঠনগুলোর বিদ্যমান কর্মসূচি ও কর্মপন্থায় আনতে হবে পরিবর্তন। নেতাদের হতে হবে শিক্ষার্থীবান্ধব, মানবিক ও দূরদর্শী। মনের কথা বুঝতে না পারলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের গ্রহণ করবে না। নেতা হতে পারবেন, কিন্তু মনের মুকুরে ঠাঁই হবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি।

এইচআর/পিআর