মতামত

ঘৃণার চাষাবাদ নয় প্রয়োজন মানবধর্মের চর্চা

নিউজিল্যান্ডে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা হতে পারে না। হতে পারে না এ কারণে যে, পৃথিবীব্যাপীই এক ভয়ঙ্কর উন্মাদনা আমাদের ব্যক্তি ও সমগ্রের নিরাপত্তাকে শুধু বিঘ্নিত করছে বললে ভুল হবে বরং আমাদের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে তুলেছে।

আমরা নিউজিল্যান্ডের মসজিদে এক শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর গুলি করে এতোগুলো নিরীহ মানুষ হত্যা নিয়ে কিছুদিন তুমুল আলোচনা করবো এবং তারপর এর চেয়ে বড় কোনো ঘটনা ঘটার পর এ বিষয়টি ভুলে গিয়ে নতুন বিষয় নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করবো। এভাবে ঘটনার সংখ্যা বাড়বে, বাড়বে হতাহতের সংখ্যা এবং শেষ পর্যন্ত এর থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না। মানুষের ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা ও বজায় রাখার এই যে ভয়ঙ্কর ও আদিম প্রচেষ্টা, আমাদের সভ্যতাকে, গণতন্ত্রের গর্বকে সামগ্রিক ভাবে আঘাত করেছে তা শেষ পর্যন্ত গোটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেয় কিনা তা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।

এক ধর্মের ওপর আরেক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় মধ্যযুগে যে পরিমাণ রক্ত ঝরেছে, তা বিশ্ববাসীকে রীতিমতো হতবিহ্বল করে তুলেছে। এমনকি একই ধর্মের বিভিন্ন শাখার মধ্যে কারটা বেশি প্রামাণ্য তা নিয়েও রক্তপাত, হানাহানি, একটি বৃহত্তর দেশ ভেঙে নতুন দেশ প্রতিষ্ঠা কিংবা একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থেকে এখনও পৃথিবী মুক্ত হতে পারেনি।

এসবের মধ্যেই পশ্চিমা বিশ্বে যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূচনা হয়েছিল তাতে ভাবা গিয়েছিল যে, পৃথিবীর মুক্তি বোধকরি এতেই লেখা আছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যখন সকল মানুষকে সমান মর্যাদা দেয় এবং প্রত্যেকের ভোটই সমান গুরুত্ব বহন করে তখন নিঃসন্দেহে বিশ্বব্যস্থায় গণতন্ত্রই হবে এক ও অদ্বিতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা যার দ্বারা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাসহ সকল প্রকার সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে দেশে দেশে এই বলে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য করা হয়েছে যে, এর ফলে রাষ্ট্রে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা হয় এবং কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের অংশগ্রহণ ঘটে না। এমনকি এই তুলনাটাও টানা হয়েছে যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রে একাধিক ধর্মবিশ্বাসের সহাবস্থান থাকতে পারে এবং রাষ্ট্র থেকে ধর্ম-বিশ্বাসকে আলাদা করার ফলে একটি সেক্যুলার সংবিধানের আওতায় সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অপরদিকে সমাজতন্ত্রে যেহেতু সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত সেহেতু সমাজতন্ত্র আসলে ধর্মকে অস্বীকারই করে এবং ধর্মবিশ্বাসীদের জায়গা সমাজতন্ত্রে নেই। মাত্র একশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বহুবিধ প্রচার ও অপপ্রচারের ফলে সমাজতন্ত্রকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে প্রায় বিদেয় করে দেওয়া হয়। এখনও যেটুকু সমাজতন্ত্র নামের অবশিষ্ট টিকে আছে তা বরং বাজার অর্থনীতির সঙ্গে আপোস করা একনায়কতন্ত্রই, এর বেশি কিছু নয়।

ফলে গণতন্ত্রের সামনে বিপদ বলে আর কিছু না থাকায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি সর্বত্র শত্রু খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে গিয়ে একেবারে সে শত্রুর জায়গাটি গ্রহণ করে ইসলাম। রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে কথা বলার কিছুই নেই কারণ এটি সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে আড়ালে রেখে ক্ষমতা ও দখলের রাজনীতি নিয়ে কাজ করে। কিন্তু শান্তিপ্রিয় ইসলাম-বিশ্বাসীদের কাছে তার ধর্ম নিতান্তই নিরীহ ও মানবতাবাদী। প্রশ্ন হলো, এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও একে কোনঠাসা করে শত্রুপক্ষে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যুদ্ধবাদী শক্তিসমূহ যে বিপুল অর্থ ও শক্তি খরচ করেছে তা কল্পনাতীত।

এবং তার ফলে একই সঙ্গে ইসলামকে সন্ত্রাসের ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করার কাজটিও করেছে, সেই সঙ্গে তাদেরকে অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্ষমতালোভী, শ্রেষ্ঠত্বলোভী হিসেবেও প্রমাণ করেছে। সবশেষে বিশ্বব্যাপী যখন এই ধর্মবাদী উগ্র শক্তিটি তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বলতে চেয়েছে, তারা এসব হামলা করেছে প্রতিবাদ হিসেবে, প্রতিরোধ হিসেবে) তখনই ইসলাম হয়ে গেছে অশান্তির ধর্ম, সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল।

রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ও নীতিনির্ধারকদের এই শত্রু-শত্রু খেলায় সাধারণ নাগরিকের জীবন যখন বিপর্যস্ত তখন পশ্চিমে সাধারণ শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক জনগণের ভেতরও নতুন করে ভীতির জন্ম নিয়েছে ক্রমাগত ইসলাম-বিরোধী প্রচারণার ফলে, দিনের পর দিন ভয়ঙ্কর ঘৃণার আবাদ করার ফল হিসেবে। এখনতো একথাও প্রচলিত যে, বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকার হাতে আর কিছুই আর রফতানিযোগ্য পণ্য নেই, অস্ত্র এবং ঘৃণা ছাড়া।

বছরের পর বছর এই ঘৃণার পাহাড় সাধারণকেও উস্কে দিয়ে উগ্রবাদী করে তুলছে অ-শ্বেতাঙ্গ, মুসলিম কিংবা অ-পশ্চিম রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিরুদ্ধে। অস্ত্রহাতে যে সকল শ্বেতাঙ্গ নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের রাস্তায় অ-শ্বেতাঙ্গ বা মুসলিম নাগরিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে তারা আসলে বড় হয়েছে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে ঘৃণার বাণী শুনে শুনে, পত্রিকার পাতায় ক্রমাগত মুসলিম সন্ত্রাসীদের আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর খবর পাঠ করে করে। কিন্তু সেখানে কখনোই কী করে তারা সন্ত্রাসী বা আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য নিজের জীবনটাকেও তুচ্ছ মনে করছে কিংবা কোথায়, কার অর্থায়নে, কার স্বার্থে জঙ্গীবাদে প্রশিক্ষণ নিয়ে ভয়ঙ্কর জঙ্গী হয়েছে সে বিষয়েও পর্যাপ্ত তথ্য তাদের হাতে নেই।

প্রশ্ন হলো, এটা যেমন মুদ্রার এক পীঠ, অন্যপীঠেও লুকোনো আছে ভয়ঙ্কর কিছু ভিন্ন সত্য, যে সত্য বাঙালি-পাঠকের ভালো লাগার কথা নয়, কারণ সেই সত্য লিখলে একজন বাঙালি লেখককে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে চাপাতির কোপে হত্যা কিংবা দেশত্যাগেও বাধ্য হওয়া লাগতে পারে, সেটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। তাহলে কি এই ভয়ঙ্কর অপশক্তি ও দুরবস্থা থেকে আমাদের কারোরই মুক্তি নেই? আগেই বলেছি যে, এই যে শত্রু ও শত্রু খেলা, এই খেলার শেষ পরিণতি আসলে কি?

উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বই আমাদের কাছে এই শিক্ষা ফেরি করেছে যে, সমাজে ভালো-মন্দ সকলই বিরাজ করবে কিন্তু তার ভেতরে ভালোকে প্রাধান্য দিয়ে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। একটি দরিদ্র রাষ্ট্রকে ক্রমাগতভাবে অর্থনৈতিক সফলতা দিয়ে গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে এবং তার ফলেই মানুষ ভালোটিকে বেছে নিতে সক্ষম হবে। কিন্তু ইউরোপ কিংবা আমেরিকার মতো বুড়ো-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কী দেখা যাচ্ছে?

ভোটের মাধ্যমেই উগ্রবাদী শক্তিসমূহ ক্ষমতা লাভ করছে। নির্বাচনী প্রচারণায় ক্রমাগত অভিবাসন-বিরোধী, অ-শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্ম তথা ইসলাম-বিরোধিতাকে উপজীব্য করে তোলা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষও নিজেদের বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা, মিডিয়ার প্রচারণার সঙ্গে ভোটের তীব্র মিথ্যাচারকে মিলিয়ে ভোটবাক্স ভরিয়ে দিচ্ছে উগ্রবাদের পক্ষে।

গণতন্ত্রে যেহেতু বহু’র পক্ষেই একচ্ছত্র পক্ষপাতিত্ব সেহেতু সরকার গঠন করেই এই উগ্রবাদী শক্তিসমূহ আগের চেয়েও বেশি পরিমাণে ঘৃণার চাষে ব্রতী হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও সুশীল বিবেক পরাজিত হচ্ছে, আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাচ্ছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের প্রতিনিধিরা। এমতাবস্থায় কেবল নিউজিল্যান্ড-এ মসজিদে মুসল্লিদের ওপর হামলা নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এর তীব্রতা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। বাংলাদেশের মতো দেশের দিকে যদি তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে গিয়ে আমরা এদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে এদেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি, অবশিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রেখেছি চিরায়ত ভয়ের মধ্যে। অপরদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যেও রাজনৈতিক ও স্বার্থের সংঘাত রূপ নিয়েছে এক রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষে।

অথচ বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে, যেখানে গণতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়ে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের মূল লক্ষ্য। কিন্তু আমরা এখন সেখান থেকে এতো দূরে সরে গিয়েছি যে, যে কেউ মনে করতে পারে যে, বাংলাদেশেও অন্য অনেক দেশের মতোই উগ্রবাদের চর্চা চলছে জোরেশোরে।

এমনকি ভারতের মতো উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও সংখ্যাগুরু নাগরিকের ভেতর যেভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তাতে সেখানেও শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেবার মতো সুস্থ বিবেকের মানুষেরা ক্রমশঃ পিছু হঠছেন। এই যে বিশ্বময় হিংসা ও ঘৃণার চাষাবাদকারী একদল শক্তিশালী মানুষ নামের অ-মানুষ দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে, তা থেকে মুক্তির একটি মাত্রই উপায় তাহলো, এদের বিপরীতে ব্যক্তি ও সমগ্র সকল ক্ষেত্রেই শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

এই প্রতিরোধ প্রথমে নিজের জীবনে, তারপর পারিবারিক ক্ষেত্রে এবং তারও পরে সমগ্রের মধ্যে এই প্রতিরোধ ছড়িয়ে দিয়ে, এই ঘৃণার বিপরীতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি অবিরাম ভালোবাসার চাষ করাটাই হবে প্রকৃত মানবধর্ম। প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যে প্রকৃত মানবধর্মের কোনো বিরোধ নেই সেই সত্যও আজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে আমাদেরই, যারা আমরা এখনও জীবিত আছি এই হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীতে।

ঢাকা ১৮ মার্চ, সোমবার ২০১৯লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। masuda.bhatti@gmail.com

এইচআর/এমকেএইচ