মতামত

আমি মুসলিম, আমারও আছে ধর্ম পালনের অধিকার

অনেক ভুলের মধ্যে আমরা বেড়ে উঠি, বসবাস করি। মনে করি, পশ্চিম মাত্রই উদার, উন্নত, আধুনিক। আর সাদা মানুষ মাত্রই মহৎ, মহান, নৈতিক, মানবিক। তা কিন্তু নয় সবসময়। এ ধারণাটি কৃত্রিম, নির্মিত, দেয়া হয়েছে দীর্ঘদিনে আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে- রীতিমত ইনজেকট করে। ঔপনিবেশিকতা এ ধারণার জন্য দায়ী। এমনকি সাদা মানুষদের সুন্দর আর ভালো মানুষ ভাববার ধারণাটিও।

এই পশ্চিমারা, সাদারাই একসময় প্রাচ্য থেকে সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে, নির্বিবাদে মানুষ হত্যা করেছে, অন্যের সম্পদ কুক্ষিগত করে নিজেদের ধনাঢ্য ‘ভদ্রলোকের স্যুটকোটে’ আড়াল করেছে। অথচ কুৎসিত, কাদাকার, অশ্লীল, জঘন্য, নোংরা, বিকৃত, পাশবিক, পৈশাচিক, অসভ্য, বর্বর মানসিকতা রয়েই গেছে তাদের ভেতরে ভেতরে।

পশ্চিমা মিডিয়া এখানে সামান্যতম ঘটনায়, হানাহানিতে, হামলায়- সন্ত্রাসী, জঙ্গি, মৌলবাদি, উগ্রপন্থি বলে বসতে এক সেকেন্ডও দেরি করে না। অথচ ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে নামাজ পড়তে আসা নিরপরাধ মুসলমানদের নির্বিবাদে হত্যাকারী ব্রেন্টন ট্যারন্টকে সন্ত্রাসী বলতে তাদের আপত্তি। এত এত মানুষ হত্যা করবার পরও ট্যারন্ট তাদের কাছে, তাদের মিডিয়ার পরিভাষায় নিতান্ত একজন- ‘শ্যুটার’। ভাবা যায় কতটা অশ্লীল, কত পাশবিক, কতটা অমানবিক পশ্চিমা মিডিয়া।

ট্যারন্ট সন্ত্রাসীদের চেয়েও বড় সন্ত্রাসী, জঙ্গিদের চেয়েও বড় জঙ্গিবাদী, মৌলবাদিদের চেয়েও জঘন্য মৌলবাদি। বর্বর, বর্ণবাদী, উগ্রপন্থি, নাশকতাকারী, নৈরাজ্যবাদী। তার ক্ষেত্রে ‘সফ্ট টোন’, ‘সফিস্টিকেটেড টার্ম’ বা ‘সফ্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ, অপ্রকৃতিস্থ এসব বলে অপরাধ হালকা করে দেবার যে প্রবণতা, সেটিও অন্যায়। দীর্ঘদিন ধরে হামলা করার, হত্যা পরিকল্পনার একজন লোক নেহাত উগ্রপন্থী, ধর্মান্ধ, সন্ত্রাসী ছাড়া আর কী?

মুসলমানদের ওপর এমন অসভ্য বর্বর হামলা এটাই যে প্রথম তা কিন্তু নয়। আল-আকসা মসজিদে জার্মান ইহুদি বারুচ গোল্ডস্টেইনের অতর্কিত হামলা, হত্যাতো মুসলিম নিধনের ইতিহাস হয়ে আছে। ২০১৭ এর জানুয়ারিতে কানাডার কুইবেকে আলেকজান্ডার নামে এক সন্ত্রাসী নামাজরত মুসল্লীদের ৬জন কে গুলি করে হত্যা করে।

২০১৭ এর জুনে লন্ডনে মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হয়ে আসা একদল মুসল্লীদের উপর চলন্ত গাড়ি উঠিয়ে দেন এক বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ। ২০১৭ এর আগস্টে বার্সেলোনায় সন্ত্রাসী হালায় ১৩ জন নিহত, আহত ৫০ জন। পুরো পশ্চিমজুড়ে মুসলমানদের উপর এমন অকথ্য নির্যাতন, হত্যা সন্ত্রাসের তালিকা তুলে ধরলে দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘতর হবে। তারপরও এসব হামলাকারীদের সন্ত্রাসী, ধর্মান্ধ-জঙ্গি, মৌলবাদী বলতে নারাজ পশ্চিম।

শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ বড় ভয়ংকর। বড় নিষ্ঠুর। বড় নির্মম। মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ববাদের নেশায় তারা বুঁদ। তারা পৃথিবীর অনেক দেশকেই আদিমানব শূন্য করেছে। রেড ইন্ডিয়ানদের ধরে ধরে হত্যা করেছে। আফ্রিকাকে করেছে আদিমানব শূন্য। অস্ট্রেলিয়াতো আরোবেনিজদের ছিল, শ্বেতাঙ্গদের ছিল না। এই বর্ণান্ধরা অভিবাসিদের, মুসলমিদেরও হত্যা করেছে।

স্যুট-কোট পরলে, কাটা চামচ দিয়ে খেলে আর শুদ্ধ ইংরেজি বললেই লোকে সভ্য হয় না। সভ্য হতে গেলে উদার হতে হয়, নৈতিক হতে হয়, মানবিক হতে হয়, মানুষ হতে হয়। বিশ্বাস করতে হয় সমতায়, মানুষের অধিকারে। থাকতে হয় অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।

যে নিউজিল্যান্ড নিজেদের এত সভ্য বলে, উন্নত, নিরাপদ দেশ বলে দাবি করে সে দেশে একজন খুনি-সন্ত্রাসী, প্রধানমন্ত্রী দফতরসহ আরো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আগাম বার্তা পাঠিয়ে মাথায় হেডক্যাম পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করতে করতে খুনের উৎসব করল। কোথায় পেল সে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র? কোন প্রতিরোধ কেন তৈরি করতে পারলো না এত উন্নত দেশটি? কেমন তাদের আইন-শৃঙ্খলা, কেমন তাদের নিরাপত্তা, কেমন তাদের গোয়েন্দা সংস্থা!

মসজিদে নিরীহ নিরস্ত্র মুসলামানদের হত্যার পর অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের সিনেটর এনিং-এর কুৎসিত চিঠি ও গণমাধ্যমে বক্তব্য দেখলে বোঝা যায়, তারা কতটা বর্ণবাদী,কতটা মুসলিম বিদ্বেষী, কতটা সভ্য লোকের ভান করা অসভ্য, অমানুষ, বর্বর।

ট্যারেন্ট খুব ভালভাবে জানে, এত এত নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করেও তার ফাঁসি হবে না। কারণ পশ্চিমে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। ফাঁসিরদ করা হয়েছে অনেক আগেই। তাই যদি হয়ে থাকে তবে লাদেনের দোষ কি?

আমি মুসলিম। আমার অধিকার আছে ধর্ম পালনের। নামাজ পড়ার। রোজা রাখার। প্রার্থনা করার। একজন মুসলিম ধর্মকে, ইসলামকে তার জীবনের অংশ বলেই মনে করে, মানে। কিন্তু এত যে সভ্য বলে প্রচারিত ইউরোপ সে রাস্তায়, প্রকাশ্যে অনুমোদন দেয় না নামাজের। উপাসনালয়ের ভেতর প্রার্থনা করতে আসা, নামাজ পড়তে আসা মুসলমানরাও আজ নিরাপদ নয়। নিরাপত্তা নেই। মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই আজ প্রতিটি রাষ্ট্রের জরুরি। তা নয় তো নিজেকে উদার বলার, আধুনিক বলার, অগ্রসর বলার অধিকার সে রাষ্ট্রের নেই।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার ধর্ম পালন করবে, স্বাচ্ছন্দ্যে নিরাপদে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি মানুষ একই বিশ্ব প্রকৃতির সন্তান, মহান স্রষ্টার সৃষ্টি। বর্ণ যাই হোক, কালো-সাদা, ধর্ম যাই হোক, প্রতিটি মানুষ একই। অন্যের অধিকারে যদি বিশ্বাস করি তবেই আমি মানুষ, তবেই আমি মানবিক। না হলে ধর্ম-বর্ণ যাইহোক, নিজেকে মানুষ বলবার কোন অধিকার আমার নেই।

পুনশ্চ: ক্রাইস্টচার্চে নির্বিচারে মুসলিম হত্যার ঘটনায় চিকিৎসক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ডা. আব্দুন নূর তুষারের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি আমাকে নাড়া দিয়েছে। লেখার অনেক তথ্য তার কাছ থেকে নেয়া। ব্যক্তিগতভাবেও অনেক বিষয় জানবার জন্য আমি তার দ্বারস্থ হই, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা, আব্দুন নূর তুষার।

লেখক : সম্পাদক, আজ সারাবেলা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র।

এইচআর/জেআইএম