অর্থনীতি

আরিফ থেকে আরিফা, অতঃপর ‘বিশেষ উদ্যোক্তা পুরস্কার’

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন সাধারণত তিন ক্যাটাগরিতে ছয়জনকে পুরস্কার প্রদান করে। এর বাইরে কখনো কখনো বিশেষ ক্যাটাগরিতে পুরস্কারও দেয়া হয়। এ বছর সেই বিশেষ উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন জামালপুরের আরিফা ইয়াসমিন ময়ুরী। গত ১৬ মার্চ এ পুরস্কার তার হাতে তুলে দেয়া হয়।

ছোটবেলায় আরিফার নাম ছিল আরিফ। আট বছর বয়সে যখন ঈদের জামা কিনতে গিয়ে শার্টের বদলে পছন্দের জায়গা থেকে মেয়েদের একটি জামা কিনে ফেলে, তখন সবার মনে প্রশ্ন জাগে। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজের চোখে ধরা পড়ে আরিফের ‘অস্বাভাবিকত্ব’। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আরিফের দৈহিক গঠন ও নারীসুলভ আচরণ বিকশিত হতে শুরু করলে সমাজ ও আত্মীয়দের কাছে ‘অস্বাভাবিক’ মনে হওয়ায় বাড়তে থাকে তার নানা হেনস্তার শিকার হওয়া।

হঠাৎ বাবার মৃত্যু হলে থমকে যায় আরিফের পড়াশোনাও। আরিফ পরিচিত হয়ে ওঠেন আরিফা ইয়াসমিন ময়ুরী নামে। তবে তিনি দমে থাকেননি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০০১ সালে এসএসসি এবং ২০১০ সালে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা শেষ করেন। কষ্ট করে পড়াশোনা করলেও তিনি চাকরি পাননি। এসএমই ফাউন্ডেশনের এক নথি থেকে জানা যায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ‘সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার্স’ পদের সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ‘আপনি মেয়েদের মতো পোশাক পরে কীভাবে কাজ করবেন?’

তবুও থামেননি ময়ুরী। তিনি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের মাঝে সচেতনা তৈরি এবং কর্মসংস্থান তৈরির কাজ শুরু করেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের পুনর্বাসন ও উন্নয়নে ২০১৩ সালে সিঁড়ি সমাজ কল্যাণ সংস্থা নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে হস্তশিল্পের কাজ শিখিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি ‘জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার-২০১৯’-এ বিশেষ উদ্যোক্তা পুরস্কার লাভ করেছেন।

এ বিষয়ে সিঁড়ি সমাজ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি আরিফা ইয়াসমিন ময়ুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে আমরা কাজ করছি। সিঁড়ি সমাজ কল্যাণ সংস্থায় ৬০ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই কাজ করে না, অনেকেই করে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং কাজে ফিরিয়ে নিয়ে আসা।’

এ বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের বক্তব্য, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও শ্রমের কাছে যে হার মানে তারই প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ময়ুরী। যদি এ সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়কে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা যায়, তাহলে তারা ভিক্ষাবৃত্তি থেকে সরে আসবে। ময়ুরীকে উদ্যোক্তা সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করার সিদ্ধান্ত কেবলই সম্প্রদায় নয়, অন্যান্য প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া সাধারণ মানুষকেও উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করা।’

ময়ুরী এখন দেশে-বিদেশে তৃতীয় লিঙ্গের বিষয়ে বিভিন্ন সচেতনামূলক সেমিনার এবং কর্মশালায় অংশগ্রহণ করছেন। সুবিধাবঞ্চিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাসহ তাদের স্থায়ী বাসস্থান, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট তৈরির লক্ষ্যে কথা বলছেন তিনি। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে সমাজক্যাণ মন্ত্রণালয় জামালপুরে ২০০ শতাংশ জমিও বরাদ্দ দিয়েছে তাকে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আরিফা পেয়েছেন ‘জয়িতা পুরস্কার-২০১৬’।

পিডি/এনডিএস/এমএস