আইন-আদালত

হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন

আদালতের আদেশের পরও বাজার থেকে মানহীন ৫২ পণ্য সরানোর বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবীকে বলেন, ‘আমাদের ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করবেন না, ৫২ পণ্য নিয়ে হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন?’

বৃহস্পতিবার (২৩ মে) হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন।

আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম। ভোক্তা অধিকারের পক্ষে ছিলেন কামরুজ্জামান কচি।

প্রাণ এ্যাগ্রোর পক্ষে ছিলেন এম কে রহমান, এসিআইর পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, সান চিপসের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম, বাঘাবাড়ী ঘি’র পক্ষে মোমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী।

আদালত বলেন, ‘আপনাদের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অফিসে রাখার দরকার কী? আপনারা তো ব্যাংকের কেরানিগিরি করতে পারেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এখানে থাকার দরকার কী? বাসায় গিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করুন।’

হাইকোর্ট আরও বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আদালতের আদেশ মানেনি। এখনও মানহীন পণ্য বাজারে আছে। তারা ধোঁকা দিয়েছেন।’

আদালত বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ১৭ জন জনবল নিয়েও আপনারা একটা দোকান থেকে কোনো পণ্য সরাতে পারেননি। ১৭ জনের দলবল নিয়ে অফিসের পাশের কোনো দোকান থেকে একটা প্যাকেটও সরাতে পারেননি।’

এ সময় আদালত নিম্নমানের ৫২ পণ্য বাজার থেকে না সরানোর কারণে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব করেন। আগামী ১৬ জুন তাকে আদালতে হাজির হয়ে বাজার থেকে ৫২টি পণ্য না সরানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।

একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুলও জারি করেন হাইকোর্ট। ২ সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি বিএসটিআই ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ৩১৩টির মধ্যে ৫২ পণ্য মানহীন বলে প্রতিবেদন দেন। তবে বাকি ৯৩ পণ্যের পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদন ১৬ তারিখের মধ্যে দিতে বিএসটিআইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

৫২ পণ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আদালতের আদেশ সংশোধন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আদালত তা আমলে নেয়ার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে পাননি।

তবে ৫২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেউ যদি তাদের পণ্য বাজারজাত করতে পুনরায় টেস্ট করাতে চায় তাহলে ১৩ জুনের মধ্যে তাদের পণ্য টেস্ট করতে বিএসটিআইকে নির্দেশ দেন আদালত।

এর আগে ১২ মে এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট বাজার থেকে আইনানুসারে এসব পণ্য সরিয়ে নিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ওই আদেশ বাস্তবায়ন করে বৃহস্পতিবার আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

বৃহস্পতিবার আদেশ বাস্তবায়নের প্রতিবেদন দেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

সারাদেশে ৫২ পণ্য জব্দের প্রতিবেদন দেয়ায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে সাধুবাদ জানান আদালত।

গত ১২ মে শিহাব উদ্দিন খান বলেছিলেন, ‘আদালত সেই ৫২ সাব-স্ট্যান্ডার্ড পণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে অপসারণের নির্দেশ দিয়ে আইন অনুসারে ব্যবস্থা (জব্দ বা ধ্বংস) নিতে বলছেন। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এসব পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়। দুইজন বিবাদী এ বিষয়ে ২৩ মে আদালত আদেশ বাস্তবায়নের প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। এ ছাড়া আদালত রুল জারি করেছেন।’

গত ৮ মে ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘কনসাস কনজুমার্স সোসাইটি’র (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান এ রিট করেন।

এর আগে তারা ওইসব পণ্য প্রত্যাহার ও জব্দ করার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে দুই সচিবসহ ৫ জনের প্রতি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন।

বিএসটিআই পরীক্ষায় ওইসব কোম্পানির ভেজাল ও নিম্নমাণের পণ্য ধরা পড়ে। এরপরও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেয়ায় গত ৬ মে ওই আইনি নোটিশ পাঠানো হয়।

বিএসটিআই-এর বরাত দিয়ে ৩ ও ৪ মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য তুলে ধরে নোটিশে বলা হয়, বিএসটিআই সম্প্রতি ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্য পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। যেখানে ৫২টি পণ্য নিম্নমানের ও ভেজাল। বিএসটিআই ওই ৫২টি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করেছে।

নোটিশে বলা হয়, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারে। কিডনি, লিভারে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের পণ্যসমূহ জব্দ না করে শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে ওইসব নিম্নমানের পণ্য বাজারে বিক্রির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

এফএইচ/আরএস/এনডিএস/আরআইপি/এমকেএইচ