হাওরাঞ্চল, দেশের অন্যতম খাদ্য ও মৎস্যভাণ্ডার। সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ জেলা ছাড়াও নেত্রকোনার বিভিন্ন উপজেলা হাওরে বিস্তৃত। এই সময়ে কৃষি ব্যবস্থায় উন্নয়ন ও প্রযুক্তি দখল করলেও হাওরাঞ্চলে সেভাবে লাগেনি এ ছোঁয়া। এমনকি কৃষি সংশ্লিষ্ট কাউকে সেভাবে কাছেও পান না কৃষকেরা। ফলে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে বোরো ধানের ভাণ্ডারখ্যাত এ হাওর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুড়ি, মদন ছাড়াও আরও কয়েকটি উপজেলায় হাওর রয়েছে। এখানে উৎপাদিত বোরো ধান জাতীয় খাদ্য চাহিদা পূরণে অবদান রেখে চলেছে। হাওরের মাছ-শুঁটকিও ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফসল ও মৎস্যের উন্নয়নে সেভাবে হাওরাঞ্চলে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
এতে কৃষকেরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তেমনই জাতীয় অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারছে না হাওরাঞ্চল। তাই এ অঞ্চলের কৃষির উন্নয়নে নেত্রকোনায় একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই) ও মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের বিকল্প নেই।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নেত্রকোনা জেলা ও উপজেলা কৃষি কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় লোকবল এবং বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে থাকলেও প্রয়োজনের তুলনা খুবই অপ্রতুল। এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে যেসব কর্মকর্তা থাকার কথা তাদেরও সেভাবে কাছে পান না কৃষকেরা।
ফলে ফসলে কিংবা মাছচাষে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলেও প্রয়োজনীয় সমাধান পান না কৃষকেরা। এক্ষেত্রে নেত্রকোনায় কৃষি বিষয়ে কোনো গবেষণা কেন্দ্র কিংবা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থাকলে সেখানে তাদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারতো। পাশাপাশি ফসলে কোনো রোগ-বালাই হলে বিশেষজ্ঞ পরামর্শও পেতেন কৃষকেরা।
মোহনগঞ্জের ছেচরাখালী গ্রামের বাসিন্দা ও কৃষক মাইদুল ইসলাম বলেন, হাওরে সাধারণত একটা ফসল হয়-সেটা বোরো। আর যে বছর আগাম বন্যা হয়, তখন সবই পানির তলে, একমুটো ধানও কেউ সংগ্রহ করতে পারে না। তখন দেশের বাজারেও ধান-চালের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু আমরা এসব ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে কৃষি অফিসের কোনো সহযোগিতা পাই না। আমাদের অনেকে জানিও না যে ফসলের কোনো রোগের ক্ষেত্রে কার কাছে যেতে হয়। এর ফলে আমরা আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা থেকে দূরে আছি।
তার সঙ্গে যোগ করে খালিয়াজুড়ি উপজেলার বোয়ালী গ্রামের বাসিন্দা শাহীন মিয়া বলেন, কৃষি অফিসে অনেকেই যায় না। কিভাবে কিংবা কার কাছে যাবে এ বিষয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন কৃষকেরা। তবে ফসলের কোনো সমস্যায় নিজেরাই আলোচনা করে সনাতন পদ্ধতিতে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। ফলে ফসলের আর ভালো ফলন হয়নি।
খালিয়াজুড়িতে কর্মরত একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রোগ্রাম অফিসার শাহীন আহমেদ বলেন, সম্প্রতি ধানের পাতা মরে যাওয়া সংক্রান্ত সমস্যায় পড়েন কয়েকজন কৃষক। তারা কার কাছে যাবেন বুঝতে পারছিলেন না। পরে নেত্রকোনা জেলা কৃষি কার্যালয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিই। তবে সমস্যার সমাধান পেতে পেতে তাদের ধানক্ষেত পুরোটাই নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, হাওরে কাজ করার সুবাদে অনেক কৃষককেই এ ধরনের সমস্যায় পড়তে দেখেছি। এই অঞ্চলে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থাকলে এখানকার মানুষের সুবিধা হয়। পাশাপাশি ওসব ছেলে-মেয়ে বিভিন্ন চাকরি ছাড়া কৃষি প্রযুক্তির কর্মমুখী শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জয়নুর রশিদ বলেন, দেশে যেসব এটিআই রয়েছে সেখানে অল্প খরচেই পড়াশোনা করতে পারেন শিক্ষার্থীরা। তবে এসব ইনস্টিটিউটে আসন সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। কৃষিসমৃদ্ধ এলাকা বিশেষ করে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলে কৃষকের ছেলে-মেয়েরা দেশের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। কারণ সেখানে এ ধরনের সুযোগও নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো ফসলের টেকসই উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষিতে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা। দেশে যে কয়টা ইনস্টিটিউট আছে সেগুলো সে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নেত্রকোনায় একটি টেকনিক্যাল কৃষি ইনস্টিটিউট করলে এ অঞ্চলের মানুষের উপকার হয়। কৃষি সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা তাদের কারিগরি দক্ষতা কাজে লাগিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষিকে শক্তিশালী, যুগোপযোগী এবং কর্মকর্তাদের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়বে।
মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষক রুকন মিয়া বলেন, নেত্রকোনায় একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষিবিষয়ক গবেষণার উপযোগী করে তোলা সম্ভব। হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আগাম বন্যায় যে পরিমাণ বোরো ফসল তলিয়ে যায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের জন্য কৃষি গবেষণা প্রয়োজন। এজন্য কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্রের বিকল্প নেই।
সম্প্রতি মোহনগঞ্জের আদর্শনগরের শহীদ স্মৃতি কলেজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ বোরো ধান উৎপাদনের ভাণ্ডার। প্রয়োজনে এখানে একটি অ্যাগ্রিকালচার ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এটিআই) স্থাপন করা হবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মঈনউল ইসলাম বলেন, নেত্রকোনার উন্নয়নে বর্তমান সরকার যে অবদান রেখেছে তার সঙ্গে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করলে আরেকটি নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে। এ অঞ্চলের কৃষিতে বিপ্লব ঘটবে। সরকার পরিকল্পনা করে নেত্রকোনায় একটি এটিআই নির্মাণ করলে কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কৃষিক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ করতে পারবে। সরকারও এর সুফল পাবে।
কামাল হোসাইন/এএম/জেআইএম