মতামত

ঈদের দিনেও মেয়েরা গৃহদাসী

ঈদের দিনটি চমৎকার। দিনটি আনন্দের। দিনটি হাসিখুশিতে মেতে থাকার। উৎসবে মেতে উঠার, সবাইকে নিয়ে। সবাই মিলে আনন্দ করবার। দিনটিতে সবাই সমান। ধনী-দরিদ্র বলে কিছু নেই। উঁচু-নিচু বলে কিছু নেই। জাত আর জাতহীন বলে নেই কিছু। ওইদিন সবাই এক। সবাই সবাইকে কাছে ডেকে নেয়, বুকে টেনে নেয়। বড় বৈষম্যহীন একটি দিন। দিনটি ভালোলাগবার, মহৎ, মহান হবার কারণ কিন্তু এই একটিই- সবাই সমান।

এত যে বৈষম্যহীন দিন, সেই দিনটিতেও নারী আর পুরুষে বৈষম্য আছে কিন্তু ঠিকই। প্রবল প্রকট বৈষম্য। আসলে একটি দিনও নেই যে দিনটি বৈষম্যহীন। যে দিনটিতে নারী আর পুরুষ একই- শুধু মানুষ। এমন দিন একটিও নেই। এমনকি ঈদের আনন্দের দিনটিও নয়।

আমি জানি লোকে আমায় গাল দেবে, মন্দ বলবে। বলবে, ভালোটাও তুমি ভালো চোখে দেখ না। সমস্যা আসলে তোমারই। কেন তোমাকে এভাবে দেখতে হবে, ভাবতে হবে। তোমার দেখার দৃষ্টিটাই ঠিক নেই। মনকে বদলাও, পরিবর্তন কর। দেখবে সবকিছু সুন্দর লাগছে। ভালো লাগছে। মহৎ, মহান মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সব বৈষম্যহীন।

আমি আসলে আমার মতো। কেন জানি প্রকৃত আর অপ্রকৃতর পার্থক্যটা বুঝি। কী করে যেন কৃত্রিম আর অকৃত্রিমের ফারাকটা ফুটে উঠে প্রবল। সাদা আর কালোকে, তেল আর জলকে, উঁচু আর নিচুকে, মূল্যবান আর মূল্যহীনের পার্থক্যটা যত আলো বা আঁধারেই হোক প্রকট, স্পষ্টভাবে অনুভব করি। বড় স্পর্শকাতর আমি। আমার অনুভূতি তার চেয়েও প্রখর।

মেয়েরা শপিং করছে, মেকআপ করছে, জড়োয়া অলঙ্কার কিনছে, সাত পদ রান্না করছে, বাড়িতে একে তাকে নেমতন্ন করছে। মনে হচ্ছে রানী, গৃহকর্তী, ঘরের মালিক, অধিকর্তা। কিন্তু ভেতরের সত্যটি হলো সে আসলে গৃহদাসী। এই দাসবৃত্তির কোনো দিন নেই। বিশেষ অবিশেষ বলে কোনো দিনকে আলাদা করা যায় না। প্রতিটি দিনই মেয়েরা গৃহদাসী। ঈদের দিনটিও ভিন্ন কিছু নয়, আলাদা কিছু নয়। এই দাসবৃত্তিই তার নারী জীবনের নিয়তি।

আর আমাদের মেয়েগুলোও কেমন যেন! যত ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, তৃণতায়ই তাদের আনন্দ। ভীষণ সুখ। খুব সামান্যতে জীবনের অর্থ খুঁজতে যায় তারা। চুঁড়ি বালায়, চুলের রংয়ে, জমকালো পোশাকে, সুগন্ধির বোতলে খুঁজতে যায় সুখ, জীবনের অর্থ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি।

মেয়েদের অবলম্বন পুরুষ। এটা মেয়েরা মেনেই নিয়েছে, মানিয়ে নিয়েছে। কখনও কখনও মেয়েরা দাসবৃত্তিকেই পরম সম্মানের বলে মনে করে, করতে ভালোওবাসে। অমন ভাবনাতে তাদের মোটেও অসম্মান নেই। অমর্যাদা নেই। ভাবে পুরুষের দাসী হওয়াটাই তার জীবনের পরম প্রাপ্তি।

আমি খুব কম ছেলেকেই দেখেছি মেয়ের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে। মেয়েগুলো বছরের পর বছর পুরুষের বাড়িতে পড়ে থাকে, আয়া বুয়া ঝি চাকরানি খেটে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে। দুর্ভোগই তাদের কাছে উপভোগ মনে হয়। স্বামীর বাড়ি বলে কথা। মার খাও, মরো, এখানেই পড়ে থাকো- অবস্থা এমনই।

অনেক মেয়েকে জানি, ন’দশ বছর হয়ে গেছে কোনো ঈদেই বাবার বাড়ি যায়নি। বাবার বাড়ি গেলে, স্বামীর বাড়ির কাজগুলো কে করবে? ঝি চাকরানির চেয়ে অমন আন্তরিকতা, বিশ্বস্ততা স্বামীর বাড়ির লোকেরা পাবে কোথায়?আমি বলছি না পুরুষদের সব সময় গিয়ে মেয়ের বাড়িতে ঈদ করতে হবে, সময় কাটাতে হবে। কিন্তু বছরে দুটো ঈদ হলে একটি ঈদতো ছেলেরা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে করতেই পারে। আমার এই চাওয়া নিশ্চয়ই অমূলক নয়, অন্যায় নয়, অপরাধ নয়।

মুখে যতই বলি নারী আর পুরুষ সমান বাস্তবে তা নয় কিন্তু। একজন ভৃত্য, অন্যজন মনিব। একজন চাকর, আরেকজন মালিক। শুধু এক ঘরে এক খাটে শুলেই দু'জন মনিব হয় না, মালিক হয় না। যৌন সম্পর্ক মহারাজ আর চাকরানির মধ্যেও হতে পারে, থাকতে পারে। রতিক্রিয়া সম্পর্কের কোনো মানদণ্ড নিশ্চিত করে তাতো নয়। বরং বোঝাপড়া ও সাম্যতাহীন রতিক্রিয়ার চেয়ে ক্লিষে আর কিছু নেই। সম্পর্কটি তখন আর সম্পর্ক নয়। গ্লানিবোধের ঘানি টানা। আমাদের বেশির ভাগ মেয়ে এই ঘানি টেনে যায় জীবনের দীর্ঘ সময়। মনে করে, মনে করানো হয় এটা তাদের জীবনের পরম পাওয়া।

আমার খুব কষ্ট হয়, মায়া হয়, করুণা হয় এই মেয়েদের জন্য।অন্যদের কী হয় জানি না!

লেখক : সম্পাদক, আজ সারাবেলা। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, মিডিয়াওয়াচ। পরিচালক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট জার্নালিজম অ্যান্ড কমিউনিকেশন। সদস্য, ফেমিনিস্ট ডটকম, যুক্তরাষ্ট্র।

এসএইচএস/পিআর