মতামত

ঈদের রকমফের : সুখ-শোকের রসায়ন

মধুমাসে ঈদ। সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। আনন্দের ওপর ঈদ। কিন্তু ঈদ কি ছুঁতে পারছে ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের পরিবারকে? চকবাজারের চুরিহাট্টার আগুনে পোড়া দু’শ পরিবার বা স্বজনদের? টেকনাফে ক্রসফায়ারের নামে গুলিতে হত্যা করা একরামের সন্তানরা কি ঈদ আনন্দের আওতাভুক্ত? কি দশা ধানের দরপতনে নাস্তানাবুদ কৃষকদের?

এ রকম অনেক পরিবারই বয়ে চলছে স্বজনহারানো সেই দুঃসহ স্মৃতি। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবারে হাহাকার। ঈদ তাদের দরজায় কড়া নাড়তে পারে না। উপরন্ত ঈদ তাদের মর্মে আঘাত দেয়।

ঈদ মৌসুমে যাতায়াতের পথে ভোগান্তিকে মানুষ হজম করে চলছে। ন’টার গাড়ি ক’টায় ছাড়াকে ঈদের অনিবার্য অংশ ভেবে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ঘটনাচক্রে বা ভাগ্যক্রমে যাত্রা বা ফিরতি পথ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হলে তা ঈদ আনন্দের হালখাতায় যোগ হয়। বিবেচিত হয় বাড়তি সুখ হিসেবে। কিন্তু, দুর্ঘটনার কারণে আনন্দের ঈদ পরিণত হয় শোকের উপলক্ষে।

এভাবেই ঈদ কারো কাছে আনন্দের সওগাত। কারো কাছে বেদনার বার্তা। অনেকের কাছে আবার মুনাফা হাতানোর মোক্ষম অস্ত্র। অবশ্যই অনেকের কাছে আত্মশুদ্ধির ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যম। ঈদ প্রশ্নে আনন্দ-বেদনাটা এভাবে আপেক্ষিক হয়ে গেছে। যার কাছে যেমন সুবিধা, যেমন বোধ-উপলব্ধি। এভাবেই রমজানের রোজার শেষে যথানিয়মে যথাসময়ে দিনপঞ্জিকা মতো ঈদের আগমন।

রোজায় যা-ই করি না কেন, গলা ছাড়িয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা অমর গীতটি বাজিয়ে জানানো হয় ঈদের চাঁদ ওঠার সংবাদ। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ এ লাইনটির পর আরো বেশ কয়েক লাইন ও পঙক্তি রয়েছে। সেগুলো বাদ দেব কেন?

তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদতোরে মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।আমরা ঈদের খাস বাংলা করি ‘আনন্দ’ নামে। ঈদ কি শুধু আনন্দের? আর কোনো শিক্ষা বা বার্তা নেই এতে? সুখের সঙ্গে কি দুঃখের কোনো ট্র্যাজেডি নেই? বিশেষ করে যাদের মা-বাবা বা স্বজনহারা বা ঈদের দিনে কাছে থাকে না তাদের জন্য কি ঈদটা আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে? আঘাতে-দুর্ঘটনায় পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ হয়ে যারা হাসপাতালে জীবন-মরণ সমস্যায় কাঁতরাচ্ছে?

চাঁদাবাজ ও মলম পার্টির কাছে আরেক ফরমেটে যুৎসই মৌসুম। কিন্তু যারা হাতের হাতে-মলমে সর্বস্বান্ত হলেন, তাঁদের? মিথ্যা মামলায় জেলে যারা? ধর্ষণের শিকার নারী-শিশু এবং তার পরিবারের ঈদই বা কেমন? পালিয়ে বেড়াচ্ছে যারা? তদের বাড়িতে স্ত্রী, পুত্র, পরিজনের মনে কি আছে ঈদের খুশি? তাদের কীসের ঈদ?

পরিবারের সুখের জন্য মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে যারা দূর প্রবাসে থাকে তাদের মনেরই বা কী অবস্থা? দুঃখের মাঝে সুখের অনুভূতি হাতড়ানো ছাড়া তাদের বিকল্প থাকে না। গ্লোবালাইজড বিশ্বের আনাচেকানাচে কে কীভাবে ঈদ করছেন তা জানা এখন অনেক সহজ। একেক জনের ঈদ অনুভূতি একেক রকম। আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মান-অভিমান সব মিলিয়ে বিচিত্র জীবনের সঙ্গে ঈদ উৎসব, আবেগ-অনুভূতিতেও ভিন্ন রসায়ন। ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় থাকা প্রবাসীদের কেউ কেউ স্বপরিবারে থাকায়, তাদের কষ্ট এক ধরণের।

মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের কষ্ট-বেদনার আরেক রং। দেশে থাকা স্বজনরা সেই রং পুরোটা জানেন না। ওইসব দেশে সবাই যখন ঈদগাহে নামাজের পর বন্ধুবান্ধব মিলে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছে, সে তখন কষ্টের পাথর বুকে বেঁধে হলের এক কোণে পড়ে থাকে। ঈদ আসে, ঈদ যায়। তাদের মনের কষ্ট মনেই থেকে যায়।

এদিকে, ছোটদের ঈদ বেশি আনন্দের। তাদের কাছে ঈদ মানে নতুন জামাকাপড়। মজার খাবার আর সালামি পাওয়ার দিন। কিন্তু সব ছোটদের ভাগ্যে কি তা জোটে? আর যাদের ঠিকভাবে দু’বেলা খাবারই জোটে না? আবার গ্রামের সাথে শহরের ঈদের অনেক তফাৎ। বিশেষ করে তিলোত্তমা ঢাকায় ইদ যার যার মতো। নামাজ শেষে ঈদগায় নামকাওয়াস্তে কোলাকুলি। জীবনের অন্য দিনের মতো ঈদের দিনটাও কেটে যায় চার দেয়ালে। নইলে একেবারে নিজেরা এখানে-ওখানে ঘুরাঘুরি। এমন উপলক্ষ আনন্দের নামে মানুষকে বেদনাই দিতে পারে।

কে জানে রমজানের সিয়াম সাধনায় সেহরি, ইফতার, তারাবি, ফেতরা, জাকাতে কার দেহমনে কদ্দুর উৎকর্ষ এসেছে? এরপরও ভাবতে বা আশা করতেই পারি এক মাসের সিয়ামের প্রশিক্ষণ বাকি এগারো মাসের জন্য নৈতিক করে তুলেছে আমাদের।

আল্লাহর দেয়া আশ্বাস মোতাবেক অশেষ পুণ্যের অধিকারী আমরা। হিংসা-দ্বেষ ভুলে কাছে-দূরে, জলে-স্থলে বাজুক ভালোবাসার বাঁশি। দুঃখ-শোক ও নানা অঘটনের ডামাডোলে কাতর হয়ে পড়ার পরও আশা জাগাতে হবে। কবিগুরুর ভাষায়: চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/পিআর